চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটার সঠিক তথ্যের পরিসংখ্যান নেই খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছেই। এ অবস্থায় হাইকোর্টের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিপাকে পড়ে গিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটার তথ্য সংগ্রহে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও মিলছে না বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এতদিন চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে জরিমানার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে এসেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সম্প্রতি এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উদ্দেশে দেয়া এ নির্দেশনা মেনে এরই মধ্যে ৩০টির মতো ইটভাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ৪০৮টি ইটভাটার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফিক্সড চিমনি (৮০-১২০ ফুট) ইটভাটা ২৮৪টি, জিকজ্যাক চিমনি ১২১ ও অন্যান্য ইটভাটা আছে তিনটি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, এসব ইটভাটার মধ্যে ৩১০টির পরিবেশগত ছাড়পত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে কিংবা কোনো অনুমোদনই নেই। অবৈধ এ ৩১০টি ইটভাটা থেকে রাজস্ব আদায়ে বঞ্চিত হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাউজানে ৩৬টি, ফটিকছড়িতে ৪৬, সাতকানিয়ায় ৩৮, হাটহাজারীতে ৪০, রাঙ্গুনিয়ায় ৬৯, চন্দনাইশে ৩২, লোহাগাড়ায় ১৫, আনোয়ারায় তিন, বাঁশখালীতে তিন, সন্দ্বীপে চার, মিরসরাইয়ে আট, সীতাকুণ্ডে পাঁচ, বোয়ালখালীতে সাত ও পটিয়ায় তিনটি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। যদিও বাস্তবে এসব উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনজুরুল হুদা বলেন, ইটভাটা স্থাপনে সরকারিভাবে নানা নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। কৃষিজমি কিংবা বসতবাড়ির পাশেই ইটভাটাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এ ইটভাটার কারণে কৃষি জমির ওপরের অংশ বিক্রি, জমির উর্বরতা নষ্ট, বনের কাঠ ব্যবহার—এ রকম নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে।

পরিবেশ দূষণ রোধে গত ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সব অবৈধ ইটভাটা এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরিবেশ সচিব, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের অবৈধ এসব ইটভাটার তালিকা তৈরি করে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন উচ্চ আদালত।

হাইকোর্টের নির্দেশনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ ইটভাটা অপসারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো। এর মধ্যে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত লোহাগড়া উপজেলায় সাতটি, ফটিকছড়ির পাঁচ, হাটহাজারীর পাঁচ, রাউজান উপজেলার সাতটি ইটভাটাসহ প্রায় ৩০টি ইটভাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে ইটভাটার সঠিক সংখ্যাগত পরিসংখ্যানের অভাব এ কার্যক্রমে অন্তরায় হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন তারা। কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বছরের পুরনো যে তালিকা তাদের হাতে আছে, তার মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই অবৈধ। অনেক এলাকায় প্রভাবশালীদের কারণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটাও এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেক উপজেলায় কী পরিমাণ ইটভাটা আছে, সেগুলো নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের সহায়তা চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে ইটভাটার সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি করা যায়নি। তাছাড়া চট্টগ্রামের মতো একটি বড় জেলায় মাত্র চারজন কর্মকর্তার পক্ষে এতগুলো অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটাও বেশ কঠিন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের (জেলা) উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ যে হালনাগাদ তথ্য ছিল, তাতে চার ভাগের তিন ভাগই অবৈধ। হাইকোর্টের নির্দেশনার পর অনুমোদনহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা সরিয়ে নিতে মালিকদের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম জেলায় আসলে কী পরিমাণ ইটভাটা আছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।

তিনি আরো বলেন, মূলত লোকবল সংকটের কারণে আমরা কাজ করতে পারছি না। তাছাড়া অনেক এলাকার ইটভাটার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছি। পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবৈধ ইটভাটার তথ্য দিয়ে গণমাধ্যম কর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।