চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশে প্রতিনিয়ত এলপিজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপরীতে এলপিজি ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হলেও এখনো দেশে পণ্যটির মূল্য প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদেরও। অন্যদিকে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গভীর সমুদ্র্রবন্দর না থাকায় দেশে পণ্যটি আমদানি করতে হয় ছোট ছোট জাহাজে করে। ফলে সব মিলিয়ে পরিবহন খরচ পড়ে যায় অনেক বেশি। এছাড়া পণ্যটি আমদানিতে যে হারে কর পরিশোধ করতে হয়, সেটিও পণ্যটির মূল্য নিয়ন্ত্রণে অন্যতম অন্তরায় বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
একই বাজারের ক্রেতা হলেও বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশে এলপিজির বিক্রয় মূল্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। কলকাতায় প্রতি কেজি এলপি গ্যাস ৫০ রুপির (৫৮ টাকা) নিচে বিক্রি হলেও ঢাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকার কাছাকাছি মূল্যে। কলকাতায় ১৫ দশমিক ৮ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৬৪০ রুপিতে (গতকালের বিনিময় হার অনুযায়ী ৭৩৮ টাকা)। অন্যদিকে বাংলাদেশে ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মূল্যে।
এ বিষয়ে গ্রাহকরা বলছেন, মূল্যসংক্রান্ত নীতিমালা না থাকার কারণেই দেশে বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর এলপিজির মূল্য পড়ছে বেশি। বিশেষ করে বাজারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সরবরাহকৃত এলপিজির মূল্যের তারতম্য নিয়ে গ্রাহকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন বেশি।
প্রসঙ্গত, দেশে বর্তমানে ৫৬টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার অনুমোদন পেলেও ব্যবসা করছে ১৮টির মতো কোম্পানি। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই ১২ কেজির এলপিজি বোতলজাত করে বিক্রি করছে। বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০০-৮৫০, ৯০০-৯৫০ এমনকি ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ সরকারি এলপিজি বাজারে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ৬০০ টাকা করে।
অন্যদিকে এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানিগুলো বেশি দামে নয়, বরং কম দামে বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। তাদের ভাষ্যমতে, এলপিজির দাম কম-বেশি হওয়ার প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত, ভারত এলপিজি উৎপাদন করে, আর বাংলাদেশ আমদানি করে। এখানেই দামের একটা পার্থক্য তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, ভারতের গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে। সেখানে তারা ৪০ হাজার টনের জাহাজ নিয়ে আসতে পারে, যে সুযোগ বাংলাদেশের নেই। দেশে এলপিজি আমদানি হয় মূলত মোংলা বন্দর দিয়ে। সব মিলিয়ে পরিবহন খরচও পড়ে যায় অনেক বেশি। তৃতীয়ত, যেখানে ভারত সরকার এলপিজিতে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়, সেখানে বাংলাদেশে পণ্যটি আমদানিতে কর দিতে হয় ২৫ শতাংশ।
দেশে পণ্যটির মূল্য বিষয়ে বসুন্ধরা এলপিজির হেড অব সেলস জাকারিয়া জালাল বলেন, এলপিজির দাম নিয়ে গ্রাহকদের জানায় এক ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সরকারিভাবে বিতরণকৃত এলপিজির দাম ৬০০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ সাধারণ জনগণ মনে করছে সরকার সব ধরনের এলপিজির দামই নির্ধারণ করে দিয়েছে। গ্রাহকদের এ ভুল আগে ভাঙাতে হবে। হিসাব অনুযায়ী, অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজি সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, দেশে এলপিজি আমদানি হয় লাইটারেজ জাহাজে করে। এসব জাহাজে একসঙ্গে আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টন পর্যন্ত এলপিজি আমদানি করা যায়। এতে পণ্যটি আমদানিতে টনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১০০ থেকে ১৪০ ডলারের মতো।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি ১৫-২০ হাজার টনের বড় ট্যাংকারে এলপিজি আনা সম্ভব হতো, তাহলে পরিবহন খরচ ৭০ ডলারের মধ্যে নামিয়ে আনা যেত। তবে এক্ষেত্রেও আরেকটি বড় অন্তরায় হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা। একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি করে তা সংরক্ষণের সক্ষমতা এখানে নেই। বাংলাদেশে পণ্যটির এত বড় বাজারও তৈরি হয়নি। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করতে না পারলে সেখানেও খরচ বেড়ে যায়।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি ও ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের পরিচালক আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে এলপিজির দাম দুটি কারণে কমানো যাচ্ছে না। প্রথমত, এলপিজি আমদানির জন্য ডিপ সি পোর্ট দরকার, যেটি আমাদের দেশে নেই। এটি থাকলে ৪০ হাজার টনের জাহাজ আমাদের দেশে আনা যেত, যেটা আমরা এখন করতে পারছি না।
দ্বিতীয়ত, বড় ধরনের এসব জাহাজে এলপিজি নিয়ে এলে কে কত টন নেবে সেটার একটা ব্যাপার রয়েছে। এসব পণ্য খালাস করতে ছোট ছোট জাহাজ প্রয়োজন হয়। যেটার জন্য আবার বড় বিনিয়োগ দরকার। কারণ এলপিজির কারখানাগুলো ছোট ছোট নদীর মোহনায়। সেখানকার গভীরতা বিবেচনায় ছোট ছোট জাহাজ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এলপিজি বাংলাদেশে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার পর্যায়ে এসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে। আমদানিকারকরা এটি কম দামে বাজারে ছাড়লেও বাজারে যাওয়ার পর পণ্যটির দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ দাম কমানোটা একটা চ্যালেঞ্জ, যেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
উল্লেখ্য, বাড়তি চাহিদা ও বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় দেশে এলপি গ্যাসের হাব গড়ে উঠেছে বাগেরহাটের মোংলায়। দেশে আমদানীকৃত এলপি গ্যাসের সিংহভাগই আসে এ বন্দর দিয়ে। এ কারণে বন্দরের নিজস্ব জায়গা ইজারা নিয়ে বা বাইরের জায়গা কিনে বসুন্ধরা, যমুনা, নাভানা, ওরিয়ন, ওমেরা, সেনা কল্যাণ, লাফস গ্যাস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে নিজস্ব কারখানা বা টার্মিনাল।
প্রতিষ্ঠানগুলো পশুর নদে ল্যান্ডিং স্টেশন করে এলপি গ্যাস বোঝাই জাহাজ নোঙর করার ব্যবস্থা করেছে। জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে টার্মিনালের ট্যাংকে জমা হচ্ছে এলপি গ্যাস। তারপর তা সিলিন্ডার ভর্তি হয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মোংলার বাইরে চট্টগ্রামে টোটাল গ্যাস, বিএমসহ বহু কোম্পানি কারখানা ও টার্মিনাল গড়ে তুলেছে।
এলপিজি খাতের আরেক কোম্পানি জি-গ্যাসের জেনারেল ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, কলকাতার সঙ্গে আমাদের বাজারে যে দামের পার্থক্য, সেখানে বেশকিছু বিষয় রয়েছে। সেখানে হলদিয়া কিংবা ধামরা বন্দরে যেসব জাহাজ নোঙর করে, সেগুলো ২৫-৩০ হাজার টন ধারণক্ষমতার। এগুলো আমাদের বন্দরে নিয়ে আসার মতো ক্যাপাসিটি নেই। ফলে ছোট জাহাজে করে পুনরায় বহন করে আমাদের স্টোরেজগুলোয় নিয়ে আসতে হয়। পণ্য পরিবহনে এখানে বড় একটা খরচ হচ্ছে আমাদের। অন্যদিকে তারা সরাসরি পণ্য খালাস করে স্টোরেজে নিয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত খরচটা তাদের নেই। এছাড়া তাদের দেশের সরকার এলপি গ্যাসে ভোক্তাদের ভর্তুকি দিচ্ছে, সেখানে গ্রাহক একটা সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে এলপিজিতে ভর্তুকির সুযোগ নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, ভারতের সরকার তাদের এলপিজি খাতে ভর্তুকি দেয়। যে কারণে সেখানে দামটা কম হয়। আমাদের এখানে ভর্তুকি নেই। তাছাড়া আমাদের এখানে বেসরকারি খাতে এলপিজির দামে রেগুলেটরির কোনো হাত ছিল না। এখন রেগুলেটরি এটা নিয়ে কাজ করছে। ফলে আসা করা যায় দামে একটা স্থিতিশীলতা আসবে।










