নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগে সয়লাব খুলনা শহর ও জেলা-উপজেলা। চাল, ডাল, লবণ থেকে শুরু করে যেকোনো পণ্য কিনতে গেলেই পলিথিনে ভরে হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। নগরীর কয়েকটি স্থানে গোপনে গড়ে তোলা হয়েছে পলিথিন কারখানা। জেলা ও পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধ এ পলিথিন অবাধে সরবরাহ করছেন সারা বিভাগে। এতে টিকতে পারছে না পরিবেশবান্ধব কাগজ ও পাটের ব্যাগের বাজার। 

খুলনার হাবীব এগ্রো জুট ব্যাগ কোম্পানির চেয়ারম্যান আহসান হাবীব বলেন, ‘নিষিদ্ধ এসব পলিথিন কারখানার কারণে কৃষিক্ষেত্রের শিল্পোদ্যোক্তাদের কারখানা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তারা এখন বিপদে রয়েছেন। অথচ পরিবেশের ক্ষতির কথা চিন্তা করে ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। তখন বিকল্প হিসেবে কাগজ ও পাটের ব্যাগের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আর আইনের প্রয়োগ না থাকায় পলিথিন কারখানা ও পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে খুলনায় গড়ে উঠেছে বেশকিছু পলিথিন কারখানা। নগরীর লবণচরা, সোনাডাঙ্গা, জিরো পয়েন্ট, কৈয়া বাজারের কাছে, গোয়ালখালী, আড়ংঘাটার তেলিগাতি এলাকার এসব কারখানায় রাত-দিন সবসময়ই চলে কর্মব্যস্ততা। যদিও তারা পিপি দানা থেকে রোল পলিথিন ও সেচ পাইপ প্রস্তুতের অনুমোদন নিয়ে উৎপাদন করছে নিষিদ্ধ পলিথিন। এছাড়া প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নগরীর বড়বাজারে ব্যবসা করছে বেশ কয়েকটি পাইকারি পলিথিনের দোকান, যারা ঢাকা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনে কার্টন ভরে পণ্য আনে।  

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, পলিথিন অপচনশীল প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ; যা পরিবেশদূষণ, পয়োনিষ্কাশনে বাধা তৈরিসহ দীর্ঘদিন পর্যন্ত অপরিবর্তিত, অবিকৃত থেকে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট ও পানি দূষিত করে। একই সঙ্গে মাটি ও পানিতে মিশে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর শরীরে পলিথিনের ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করছে। পরে এগুলো খাদ্য হিসেবে যাচ্ছে মানুষের শরীরেও। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের (বিভাগ) অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘গবেষণায় খুলনার বিভিন্ন এলাকার মাটি ও পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহেও মিলছে এর উপস্থিতি। এ মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর।’ পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহারের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতিতে পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপক হারে কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প কিছু ব্যবহারের পরামর্শ দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক। 

খুলনা নগর ও জেলা-উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে যেকোনো কিছু কিনতে গেলেই তা দেয়া হচ্ছে ছোট-বড় পলিথিন ব্যাগে। আলু, তরকারি বা একটু বেশি ওজনের কিছু কিনলেই দেয়া হচ্ছে মোটা ধরনের পলিথিন ব্যাগ। কোনো বাধা না থাকায় ক্রেতারাও পলিথিন ব্যাগে করে বাজার করে নিয়ে যাচ্ছেন। জেলা-উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দোকানিরা বলছেন, পলিথিন তুলনামূলক সস্তা। এর বিকল্প হিসেবে কম দামে কিছু তৈরি হয়নি। নেটের ব্যাগের দামও অনেক বেশি। তাছাড়া মানুষ পলিথিন ছাড়া পণ্য ক্রয় করতে চায় না। এ কারণে মালপত্র দেয়ার জন্য তারা পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করেন।

দোকানিরা জানান, আগে যেসব দোকান থেকে তারা পাইকারি হিসেবে সরাসরি পলিথিন ব্যাগ কিনতেন, সেসব দোকান এখন আর সরাসরি পলিথিন ব্যাগ বিক্রি করে না। খুব বেশি পরিচিত বা বিশ্বস্ত না হলে ব্যাগ দেয় না। এর বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা সাইকেলে ঘুরে ঘুরে পলিথিন ব্যাগের ফরমায়েশ নেন। পরে গোপনে ওই দোকানগুলোয় তা সরবরাহ করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগের সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘যেকোনো ধরনের পলিথিন পরিবেশে ১০০ বছরেরও বেশি টিকে থাকে। তার পরও বাজারে খোলামেলাভাবেই নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে, যা খুবই উদ্বেগ ও হতাশার। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর আইন থাকার পরও নিষিদ্ধ পলিথিন বিক্রি বন্ধ করা যাচ্ছে না। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনকেও আন্তরিক হতে হবে।’ 

খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলেই ২০০২ সালের ১ মার্চ সরকার আইন করে নির্দিষ্ট পুরুত্বের বাইরে সব ধরনের পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আইন অমান্যকারীর জন্য ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়। বাজারজাত করলে রয়েছে ছয় মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা। পলিথিনের বিরুদ্ধে খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। পলিথিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’