তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। সে পথে অনেক দূর এগিয়েও গেছে বাংলাদেশ। ব্যাংক লেনদেন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক কাজই এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অথচ এখনো অনেকটা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই কার্যক্রম চলে দেশের পুঁজিবাজারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের উদ্যোগের অনেক আগেই ১৯৯৮ সালে অটোমেটেড প্লাটফর্মের মাধ্যমে লেনদেন চালু হয় দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। কিন্তু এরপর ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও শেয়ারবাজারের জন্য একটি সমন্বিত ও একীভূত অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। যে কারণে নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে লকডাউনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারের কার্যক্রম চালু থাকলেও বাংলাদেশে বন্ধ রাখতে হয়েছে লেনদেন।

স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে অটোমেটেড লেনদেন চালু থাকলেও সেটি শুধু ট্রেডিং ও সার্ভিল্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ এর বাইরে আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো অটোমেটেড সিস্টেমের আওতায় থাকা আবশ্যক। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারের লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য যে অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) রয়েছে, সেটি থাকে ব্রোকারেজ হাউজের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশে ওএমএস সিস্টেম পরিচালনা করছে স্টক এক্সচেঞ্জ। এতে প্রতি বছর ফি বাবদ বড় অংকের অর্থ গুনতে হচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জকে। দেশে লেনদেন সম্পন্ন করতে ব্রোকারেজ হাউজের ওয়ার্ক স্টেশন পরিচালনার জন্য এখনো ব্যক্তির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কাউকে না কাউকে সশরীরে উপস্থিত থেকে এটি চালু রাখতে হবে। আবার ব্রোকারেজ হাউজের যে কার্যালয় বা শাখার জন্য ওয়ার্ক স্টেশন নির্ধারিত রয়েছে, সেটি যদি অন্য কোথাও স্থানান্তর কিংবা পরিচালনা করতে হয়, তাহলে সেক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। তাছাড়া শেয়ার কেনাবেচার পর সেটেলমেন্ট সম্পন্ন করতে ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে হয়। এটিও করতে হয় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউজের তথ্য আদান-প্রদান এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই হচ্ছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে যে তথ্য পাঠাচ্ছে, সেটিও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই। শুধু তা-ই নয়, আইনি কাঠামোতেই সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে এসব তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দিতে হবে। তার ওপর একটি সমন্বিত ও একীভূত অটোমেটেড সিস্টেম প্রবর্তনে স্টক এক্সচেঞ্জে দক্ষ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে বর্তমানে ৩৬ জন প্রকৌশলী কাজ করছেন, যেখানে প্রয়োজন ৭০-৮০ জন। এসব কারণে দেশের পুঁজিবাজার এখনো ম্যানুয়ালই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা সেভাবে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নয়ন করতে পারিনি। এ কারণে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজার চালু থাকলেও আমাদের এখানে বন্ধ রয়েছে।

চীনের শেনঝেন-সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসইর পর্ষদে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছে। ডিএসইর তুলনায় নবীন হলেও শেনঝেন-সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম পুরোপুরি অটোমেটেড। সেখানে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই বেশির ভাগ লেনদেন হয়। ডিএসইর সঙ্গে চুক্তির সময় বেশকিছু কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীনা কনসোর্টিয়াম, যার মূল্য উল্লেখ করা হয় ৩০৮ কোটি টাকা। তাদের প্রতিশ্রুত কারিগরি সহায়তায় মধ্যে রয়েছে ডিএসইর ট্রেডিং ও সার্ভিল্যান্স সিস্টেমের আধুনিকায়ন, বিজনেস প্রসেস ম্যানেজমেন্ট (বিপিএম) সিস্টেম কনসাল্টিং প্ল্যান, বন্ডের টেন্ডার সিস্টেমের জন্য কনসাল্টিং সার্ভিস, ইনফরমেশন ডিসক্লোজার সিস্টেমের জন্য কনসাল্টিং সিস্টেম প্ল্যান, ডাটা সেন্টার ও কো-লোকেশনের জন্য কনসাল্টিং সার্ভিস প্ল্যান, এফডিইপি ও ফিন্যান্সিয়াল ক্লাউড টেকনোলজি স্থানান্তর পরিকল্পনা ইত্যাদি। এসব কারিগরি প্রযুক্তির জন্য ১০ বছরের লাইসেন্স এবং ৩ বছরের ট্রেনিং ও কনসাল্টিং সার্ভিস সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দেয়ার কথা। যদিও চুক্তির পর দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ডিএসইর কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা নেয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান নয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কম। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ডিজিটাল মাধ্যমের তুলনায় এখনো ব্রোকারেজ হাউজে এসে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাছাড়া ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের মতো দক্ষতা ও সুবিধা সব বিনিয়োগকারীর রয়েছে কিনা সেটিও একটি বিষয়। এসব কারণে আমাদের এখানে সমন্বিত অটোমেটেড ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে পুঁজিবাজার বন্ধ রয়েছে অনেকদিন হলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে নগদ অর্থের জন্য অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর শেয়ার বিক্রি করার দরকার হতে পারে। তাই আমি মনে করি, সীমিত পরিসরে হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজার চালু করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার।

পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (সিএমডিপি) শীর্ষক তিনটি প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৩ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিএসইসির কার্যক্রমকে পুরোপুরি অটোমেটেড করার কথা থাকলেও এখনো এর অধিকাংশ কার্যক্রমই চলছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে।

পুঁজিবাজারে একটি সমন্বিত ও একীভূত অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে না ওঠার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি বলে মনে করছেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের এখানে আরো অনেক আগেই পুরোপুরি একটি অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে ওঠা উচিত ছিল। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারে যে অটোমেশনের প্রক্রিয়া সেটি সম্পর্কে যে সংশ্লিষ্টরা অবগত ছিলেন না এমন নয়। আমি মনে করি, তারা এটিকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি। এক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দূরদর্শিতার অভাবও রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যেখানে সারা বিশ্বেই পুঁজিবাজারের কার্যক্রম চলছে। এতে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারণ তারা নিজেদের প্রয়োজনে শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলতে পারছেন না।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কর্মকর্তারা বলছেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ বাজার তাদের, তাই তাদেরই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। ১৯৯৮ সালে যখন পুঁজিবাজারে অটোমেটেড লেনদেন পদ্ধতি চালু হয়, তখন নেতৃস্থানীয় বেশকিছু ব্রোকার এর বিরোধিতা করেছিল। তারা নিজেরাই যদি নিজেদের উন্নয়নের বিরোধিতা করে তাহলে কীভাবে হবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন কর্মকর্তা বলেন, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের এখানেও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি পুরোপুরি অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল), ব্রোকারেজ হাউজ, স্টক এক্সচেঞ্জ ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে একটি সমন্বিত এবং একীভূত অটোমেটেড সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে।

>>বিশ্বব্যাপী চালু থাকলেও বাংলাদেশে বন্ধ