বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ গত দেড় বছর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্প এলাকায় নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স না দেয়া ও নবায়ন না করায় চরম বিপাকে পড়েছেন এখানকার বেশির ভাগ শিল্প মালিকরা। ফলে নতুন করে কোনো উদ্যোক্তাই এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারছেন না। পুরনো যারা আছেন তারাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। এজন্য উদ্যোক্তারা সিটি করপোরেশনের অসহযোগিতার অভিযোগ করছেন।

বরিশাল নগরীর বিসিক শিল্প এলাকায় নিত্যপণ্য উৎপাদনের একটি ক্ষুদ্র কারখানায় এক সপ্তাহ আগে অভিযান চালায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। পণ্য উৎপাদন অনুমোদন না থাকায় কারখানা মালিককে অর্থদণ্ড দেয় বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ।

নিত্যপণ্যে কারখানা মালিকের অভিযোগ, বিএসটিআই অনুমোদনের আবেদন করতে ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি দিতে হয়। বিসিকের শিল্প মালিকদের বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে না। যে কারণে বিএসটিআইতে পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন আবেদনও করতে পারেননি তিনি। 

জানা গেছে, বরিশাল বিসিকের বেশির ভাগ শিল্প মালিকই এ সমস্যায় আছেন। অজ্ঞাত কারণে গত প্রায় দেড় বছর যাবত নতুন উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে না বিসিসি। আগের ট্রেড লাইসেন্সধারীদের নবায়নও নেয়া হচ্ছে না। ট্রেড লাইসেন্স না থাকায় আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের (ব্যাংকিং) সেবাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।  স্থানীয় এক শীর্ষ রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধির বৈরী আচরণের অভিযোগও রয়েছে বিসিকের প্রতি। যে কারণে বিসিকে শিল্প কারখানা গড়তে অনাগ্রহী নতুন উদ্যোক্তারা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিচু জমি ভরাট করে প্লট তৈরি এবং সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের অক্টোবরে বিসিকে ৭৪ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তখন মূল সড়কের পাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণে চার ফুট জমি ছেড়ে দেয়ার দাবি তোলে বিসিসি। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও ফরচুন সুজ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয় এবং পরিস্থিতি একাধিকবার হামলা-মামলা পর্যন্ত গড়ায়। মিজানুর রহমানের ভাই ছিলেন উন্নয়ন প্রকল্প কাজের ঠিকাদার।

ব্যবসায়ীরা জানান, এরপর থেকেই বিসিকের ব্যবসায়ীদের বিসিসি নতুন ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে না এবং আগের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন নেয়া হচ্ছে না। প্রায়ই রাতের আঁধারে কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগের তার চুরি হয়ে যায়।

বিসিক ব্যবসায়ীদের কেন ট্রেড লাইসেন্স পাচ্ছে না জানতে চাইলে বিসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিসিকের কাছে ট্যাক্স বাবদ কয়েক লাখ টাকা পাব। তারা টাকা দিচ্ছে না। তাই আমরাও সেখানকার কোনো ব্যবসায়ীকে ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছি না ও পুরনোদের নবায়ন নিচ্ছি না। শহীদুল ইসলাম জানান, ট্রেড লাইসেন্স না দেয়ায় বিসিকের এক ব্যবসায়ী আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এটাও ট্রেড লাইসেন্স না দেয়ার একটা কারণ।

এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া একজন ব্যবসায়ীর নাগরিক অধিকার। বরিশাল বিসিকের ব্যবসায়ীদের সিটি করপোরেশন কেন ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে না তা আমাদের জানা নেই। সিটি করপোরেশনের এ আচরণ প্রধানমন্ত্রীর উন্নত বাংলাদেশের ভিশনকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি স্বীকার করেন, বরিশাল বিসিকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না থাকায় গত এক বছরের মধ্যে তিনি চারটি নতুন কারখানা করেছেন ঢাকা ও গাজীপুরে। এতে বরিশালের কর্মজীবীরা বঞ্চিত হওয়ায় তিনিও মর্মাহত। 

বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খান বলেন, এভাবে ট্রেড লাইসেন্স আটকে রাখা হলে বরিশাল বিসিকে নতুন শিল্পায়নের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সার্বিক বিষয় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমকে জানানো হয়েছে।

বরিশাল বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জালিস মাহমুদ বলেন, ৭৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ৩৭ একর নিচু জমি ভরাট করে ১১০টি প্লট করা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে উদ্যোক্তারা এখানে কারখানা স্থাপন করছেন না। তিনি বলেন, পদ্মাসেতু চালুর পর বরিশালে শিল্পায়নের যে বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, বরিশাল বিসিক পূর্ব থেকেই তার প্রস্ততি নিয়ে রেখেছে। উল্লিখিত সমস্যাসহ তার প্রতিষ্ঠানের জনবল সংকটও রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছাই এসব সমস্যা দূরীকরণের একমাত্র উপায়।

উল্লেখ্য, বরিশাল নগরীর কাউনিয়া ১৯৬০ সালে ১৩০ একর জমি নিয়ে বিসিক শিল্প এলাকা গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেখানে ১৭৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ১১৭টি চলমান।