অভাব-অনটন আর সামাজিক বঞ্চনা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত প্রায় ১ হাজার ২০০ বাঘবিধবা নারী। এসব বাঘ-বিধবা নারী সাংসারিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত তাদের শুনতে হচ্ছে অপয়া, অলক্ষ্মী, ডাইনি ইত্যাদি নিপীড়নমূলক শব্দ।
সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন চকবারা গ্রামের বাঘবিধবা নারী রাশিদা বেগম (৫০) জানান, ৮/১০ বছর আগে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন স্বামী আলম গাজী। স্বামীর রেখে যাওয়া শুধু কয়েক শতক জমির বসতভিটায় কোনোরকম মাথা গুঁজে চার সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। রাশিদা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে একদিকে যেমন আর্থিক অনটন, অন্যদিকে সমাজের নানা ধরনের বঞ্চনা এবং কুসংস্কার নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। শুধু তাই নয়, স্বামীকে বাঘে ধরার খবর পাওয়ার পর থেকে পরিবারের লোকজনের মুখ থেকে আমাকে এখনো অপয়া, অলক্ষ্মী গাল শুনতে হয়। এমন দুরবস্থার মধ্যেও তিনি আজ পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি ।
একই গ্রামের বাঘ-বিধবা নারী মুর্শিদা বেগম (৩৭) জানান,
দুই বছর
আগে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত হন স্বামী রেজাউল ইসলাম। তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে জীবনযাপন করছেন। মুর্শিদা আরো জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর যে কষ্ট পেয়েছেন তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন সমাজের মানুষের তীব্র বাক্যবাণে। স্বামীর স্বজনের বাড়ি গেলে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, কথাও বলতে চান না। কারণ আমারই কারণে বাঘে ধরেছে স্বামী রেজাউলকে। এ রকম নানা কুসংস্কার ও সামাজিক বঞ্চনা মাথায় নিয়ে দিন কাটছে আমার। শুনেছি বৈধ পাসধারী কোনো বনজীবী বাঘের আক্রমণে নিহত হলে সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা পাইনি।
রাশিদা বেগম ও মুর্শিদা বেগমের মতো একইভাবে মানসিক কষ্টের বর্ণনা দিলেন সুন্দরবনলাগোয়া শ্যামনগর উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের বাঘ-বিধবা নারী রহিমা বেগম, পার্শ্বেমারী গ্রামের সুখজান বিবি, গাবুরা গ্রামের খাদিজা খাতুন ও সোরা গ্রামের আনোয়ারা বেগম। এসব বঞ্চনার শিকার বাঘ-বিধবা নারী তাদের পুনর্বাসনে সরকারের সাহায্য কামনা করেন। তাদের মতো সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল শ্যামনগর উপজেলায়ই পাঁচ শতাধিক বাঘ-বিধবা নারী মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের অ্যাভোকেসি কর্মকর্তা পরিতোষ কুমার জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন উপজেলা সাতক্ষীরা শ্যামনগর ও খুলনার কয়রা এলাকার বাঘ-বিধবাদের নিয়ে কাজ করছে তার সংস্থা। লিডার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও পাশের কয়রা উপজেলাতেই ১ হাজার ১০০ জন বাঘ-বিধবা নারী রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০০ জন বাঘ-বিধবা নারীর সহায়তায় কাজ করছে লিডার্স। এছাড়া শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ও গাবুরা ইউনিয়নে ১২০ এবং কয়রার বেতকাশি ইউনিয়নে ১৮০ জন।
সাতক্ষীরার সুন্দরবন পশ্চিম জোন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা এমকেএম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী জানান, বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে যদি কোনো মৌয়াল, জেলে বা বাউয়ালি বাঘের আক্রমণে নিহত হন তাহলে সরকার তার পরিবারকে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কেউ আহত হলে তাকেও ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত বিধিমালা ২০২১-এর অধীনে এ ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। তিনি আরো বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি যেসব বাঘ-বিধবা নারী রয়েছেন তাদের বিনামূল্যে পাস দেয়া হচ্ছে। তারা যেন নদীতে মৎস্য আহরণের মাধ্যমে অন্তত কিছু উপার্জন করে সংসার নির্বাহ করতে পারেন। তবে বুড়িগোয়ালী রেঞ্জের অধীনে সরকারিভাবে বাঘের আক্রমণে নিহতের পরিসংখ্যান দিতে পারেননি তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে জানান, সাতক্ষীরায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার যেসব বাঘ-বিধবা নারী রয়েছেন সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেবে। তাছাড়া কিছু এনজিও বাঘ-বিধবাদের নিয়ে কাজ করছে।










