দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের দিন এগিয়ে এলেও জোটসঙ্গী দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা কীভাবে হবে সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট করেনি আওয়ামী লীগ। এ অস্পষ্টতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ১৪ দলীয় জোটে থাকা বামপন্থী নেতারা। মূলত প্রভাব কমে যাওয়ার কারণেই তারা এখন কম গুরুত্ব পাচ্ছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাছাড়া বিএনপিহীন নির্বাচনকে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করার বিষয়েই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা।
রাজনৈতিক প্রয়োজনে প্রথমে ১৫ দল, তারপর আট দল পেরিয়ে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিরোধী প্লাটফর্ম হিসেবে ১৪ দলীয় জোট গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় জাতীয় পার্টিসহ আরো বেশ কয়েকটি দল নিয়ে ‘মহাজোট’ গড়লেও ১৪ দলকেই ‘আদর্শিক জোট’ বলে আসছে বর্তমানে সরকারে থাকা দলটি। এ জোটের শরিক অন্য দলগুলো হলো বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ, তরিকত ফেডারেশন ও জেপি। যদিও এদের মধ্যে কেবল চারটি দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
একাদশ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের জন্য আওয়ামী লীগ আসন ছেড়েছিল কেবল ১৩টি। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে পাঁচটি, জাসদ (ইনু) তিনটি, জাসদ (আম্বিয়া) দুটি, তরিকত ফেডারেশন দুটি ও জেপি মঞ্জুকে দেয়া হয়েছিল একটি আসন। অথচ দশম জাতীয় সংসদে ১১টি আসন পেয়েছিল ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ। ২০১৮ সালে এসে সেটি দাঁড়ায় ছয়টিতে। তাছাড়া নবম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে যে সরকার গঠন করেছিল তাতে টেকনোক্রাট মন্ত্রী হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। পরে সেই মন্ত্রিসভায় বছর দুয়েক পর অর্থাৎ ২০১২ সালে যুক্ত হন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। দায়িত্ব সামলিয়েছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের। অন্যদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য গঠিত সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায় ডাক ও তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেমন। ওই বছরের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে তাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। একই মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী হন ইনু। তবে বাদ পড়েন দিলীপ বড়ুয়া। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৪ দলীয় জোট তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এলে সরকারে আর জোটসঙ্গীদের রাখেনি আওয়ামী লীগ।
এদিকে বর্তমান সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না আসার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের মাঠে রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। তাই নতুন কৌশল নিয়ে এগোতে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের। আগের ভোটগুলোয় যে জোটের হিসাব-নিকাশ করে ভোটে নেমেছিল, এবার সেখান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে।
এবারের আসন বণ্টন নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে তিনি এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘আসন বণ্টনের বিষয় আসলে পরস্পর সমঝোতার বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বের বিষয় হচ্ছে, আপনি নির্বাচনে জেতার মতো কিনা? শরিক হলেই তাকে নমিনেশন দেয়া হবে না। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার যোগ্য প্রার্থী না হলে শুধু শরিক বলেই কাউকে মনোনয়ন দেবে না আওয়ামী লীগ।’
আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে দুটি বাদে সব আসনেই নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফাঁকা থাকা একটি আসনের মধ্যে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২। সেখানে আওয়ামী লীগ কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে ঢাকা-৮ থেকে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিমকে। এ আসন থেকেই গত তিন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এবার তিনি বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) ও বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। অন্যদিকে দিলীপ বড়ুয়া কোনো নির্বাচনেই আসন পাননি। এবার চট্টগ্রাম-১ থেকে ভোটে লড়ার জন্য নিজের দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে রাশেদ খান মেনন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমরা জোটবদ্ধভাবে আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন ও সরকার গঠন করেছি। অতীতের সেই ধারাবাহিকতায় জোট কার্যকর থাকা উচিত ছিল। তবে এবার জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। তাই জোট থাকবে কিনা সে বিষয়ে এখনো বলা সম্ভব না। আর সেটি না হওয়ায় একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিরূপ প্রতিক্রিয়াও আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এককভাবেই নির্বাচনে যাবে। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের আসন দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এখন আসন সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি হওয়ায় বণ্টন নিয়ে কথা হচ্ছে।’
১৪ দলীয় জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা না আসায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৪ দলীয় জোটকে একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সবসময়ই উল্লেখ করেছেন। যেখানে সংকট আছে, এ সরকারকে উৎখাত করার জন্য বিদেশী শক্তিগুলো ষড়যন্ত্র করছে, সেখানে এ জোটের কোহেসিভনেস ও কর্মকাণ্ড অপরিহার্য। ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের আসন না দিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক হিউমিলিয়েশন করা হয়েছে। এটি কোনো অবস্থায়ই জোটের জন্য ভালো নয়। আসন্ন নির্বাচনে জোটের শরিকদের কিছু আসন দিলে এ ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখত।’
জোটের পক্ষ থেকে আসন না পেলে জোট ভেঙে দিয়ে পুনরায় ১১ দলীয় জোটে ফিরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বিপ্লবের জন্য সংগ্রাম করছি। ফলে উনি (আওয়ামী লীগ সভাপতি) কী দিলেন না দিলেন সেটি কোনো বিষয় নয়। আমরা উনার সুবিবেচনা আশা করছি। যখন সুবিবেচনা পাব না তখন আমরা অ্যাকশন নেব। অ্যাকশন হতে পারে যে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করলাম। জোটে আমাদের মূল্যায়ন না থাকলে আমরা ১৪ দলীয় জোট ভেঙে দিয়ে অতীতের ১১ দলীয় জোট পুনর্গঠন করব। অর্থাৎ মাইনাস আওয়ামী লীগ করে আমরা এক জোট হয়ে যেতে পারি।’
শুরু থেকেই ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্রের পাশাপাশি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। তবে ২০২০ সালের ১৩ জুন তিনি মারা যাওয়ার পর জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব দেয়া হয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুকে। অসুস্থতার কারণে তিনিও অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলে জানান শরিকরা। আর এসব কারণেই জোটের প্রভাব কমেছে বলে মনে করছেন তারা।
বামপন্থী একটি দলের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর বামপন্থী দলগুলো জোটে থাকা সত্ত্বেও ভোটের আগে তাদের নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি। অন্যদিকে ইসলামিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় বসছেন। ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর পাশাপাশি সাম্যবাদী দল থেকে প্রধানমন্ত্রী ও উনার এপিএসসহ আরো কয়েকজনকে বারংবার কল দিয়েও কোনো যোগাযোগ করা যায়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘জোটের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। খুব শিগগির বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এবারে প্রত্যেকটি আসনেই প্রার্থীর জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।’
আসন্ন নির্বাচনে জোটে থাকা বামপন্থী জোটগুলোর প্রসঙ্গে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৪ দলের সর্বশেষ বৈঠকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের জোটভিত্তিক নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ করে জোটনেত্রী শেখ হাসিনা চিঠি দিয়েছেন; একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা জোটের শরিকরা ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুর সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে কথা হয়েছে; তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন যে রাজনৈতিক কারণেই ১৪ দলীয় জোট, সেই কারণ বিদ্যমান। সুতরাং একসঙ্গে ভোট হবে এবং ভোটের পরও জোট অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন যেটা সমস্যা প্রত্যেক দল যার যার মনোনয়ন দিয়েছে। সেই মনোনয়নের ভেতর থেকে সমন্বয় করে জোটের কতজন প্রার্থী থাকবে সেটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করবে। প্রত্যেকটি দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসবে এবং আসন বণ্টনের ব্যাপারটি ফয়সালা করবে। সব মিলিয়ে জোটের প্রার্থী তালিকা তৈরি হওয়ার পর ঘোষণা করা হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে কারা অংশ নেবে, ভোট কেমন হবে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অবস্থা কেমন হবে, ডামি প্রার্থীসহ এমন নানা রকম ইস্যু রয়েছে। জোটসঙ্গীরা নৌকা মার্কায় নির্বাচন করবে কিনা, এর মধ্যে জাতীয় পার্টি কীভাবে নির্বাচন করবে সে বিষয়গুলোও সামনে আসছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আজকে যে অবস্থা আগামী তিন-চারদিনে বর্তমান চিত্রটি পরিবর্তিত হবে বলে আশা করছি। তবে আমার ধারণা, ১৪ দলীয় জোটের অন্তত কিছু লোক নৌকা মার্কায় নির্বাচন করছেন। এটি বলার পেছনে কারণ হলো দুটি স্থানে নির্বাচনী আসন খালি রাখা হয়েছে। আরেকজন বড় নেতার ক্ষেত্রে দেখছি, তার আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তাই তিনি তার আদি নিবাস থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। জোটের শরিকদের মধ্যে এমন একাধিক নাম আছে যাদের রাজনীতিতে ভার আছে। সুতরাং তাদের একটি মূল্যায়ন হবে বলে মনে করা যায়।’










