গেল বছর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে সুন্দরবনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাস উৎসব ও পূণ্যস্নান উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী মেলার আয়োজন বন্ধ ছিল। এবছরও করোনা পরিস্থিতিতে রাস পূজায় কোন মেলার আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তবে বন বিভাগের নির্ধারিত বিভিন্ন শর্ত মেনে শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীরা রাস পূর্নিমার পূজা ও পূণ্যস্নানে অংশ নিতে পারবেন।

আগামী ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরবনের দুবলার চরে রাস পূজা ও ৩০ নভেম্বর সকালে দুবলার চর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে পূণ্যস্নানের মাধ্যমে এবারের রাস উৎসব শেষ হবে বলে জানিয়েছে  বাগেরহাট জেলা প্রশাসন।

গতকাল সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত রাস পূর্ণিমার পূজা ও পূণ্যস্নান উপলক্ষে রাস উৎসব ও পূজা উদযাপন আয়োজনের জন্য সমন্বয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে সভায় বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায়, সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মাদ বেলায়েত হোসেন, সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন, দুবলা ফিশার ম্যান গ্রুপ ও রাস মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি এস এম কামাল হোসেন, সহ-সভাপতি বাবুল সরদার, সাধারণ সম্পাদক প্রদীপবসু শন্তু, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ বিদেশ থেকেও অনেক ভক্ত আসেন এই মেলায়। এবছর করোনার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে রাসপূজা উপলক্ষে রাস মেলার আয়োজনের সুবিধা-অসুবিধা ও সংক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শর্তে সাপেক্ষে স্বাস্থ্য বিধি মেনে শুধু সনাতন ধর্মালম্বীদের পূজা ও পূণ্যস্নানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শর্তগুলো হচ্ছে, ২৮ নভেম্বর রাস পূজা ও পূণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে। ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাস পূজা এবং ৩০ নভেম্বর সকালে পূণ্যস্নানের মাধ্যমে এবারের পূজা শেষ হবে। ভক্তদের সুন্দরবনে প্রবেশ থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। রাসপূজায় আগত সকল জলযান এবং পূজা স্থলে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী (হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশ) রাখতে হবে। শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীরা প্রবেশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের অন্তত সাত দিন আগে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের অফিসে ভক্তদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও লঞ্চের কর্মচারীদের তালিকাসহ আবেদন করতে হবে। সুন্দরবনে রাস পূজার জন্য প্রবেশের অনুমতি প্রাপ্ত সকলকে জাতীয় পরিচয়পত্র সাথে রাখতে হবে। শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা তাদের সাথে রাখা জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা করবেন।

এছাড়াও শর্তে বলা হয়, কোন ট্রলার বা লঞ্চে ৫০ জনের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না। প্রত্যেক ভক্তকে তিন দিনের জন্য ৫০ টাকা, নিবন্ধনযুক্ত ট্রলারকে ২‘শ টাকা এবং নিবন্ধনবিহীন ট্রলার প্রতি ৮‘শ টাকা সরকারি রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে রাস পূজায় সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য।

রাস মেলায় প্রবেশের জন্য পাঁচটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। রুটগুলো হচ্ছে, বুড়িগোয়ালিনি, কোবাদক থেকে বাটুলা নদী-বল নদী-পাটকোষ্টা খাল হয়ে হংসরাজ নদী অতপর দুবলার চর।কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া, শিবসা নদী মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী-চাঁদপাই স্টেশন-তিনকোনা দ্বীপ হয়ে দুবলার চর। বগী-বলেশ্বর-সুপতি কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর। তবে শুধু সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে রুটের সংখ্যা কমানো হতে পারে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এবারের রাস পূজায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে বনরক্ষীদের পাশাপাশি র‌্যাব-৬ খুলনা, কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন মোংলা, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও নিয়োজিত থাকবেন। রাস উৎসবে আিইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যতীত কেউ আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবেন না। 

এবারের রাশ পূজা উপলক্ষে পরিবেশ দূষণ রোধেও ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পূজায় আগত ভক্ত ও সংশ্লিষ্ট সকলের খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্যাকেটসহ বিভিন্ন দ্রব্য সাগর, নদী বা চরে ফেলা যাবে না। ট্রলারে রাখা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।