গ্যাস সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকের প্রকৃত ব্যবহারভিত্তিক বিল প্রণয়নে ২০১৫ সালে ইভিসি (ইলেকট্রনিক গ্যাস ভলিউম কারেক্টর) মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। বিতরণ কোম্পানিগুলোর আওতায় থাকা সব গ্রাহকের আঙিনায় এ মিটার স্থাপনের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে এ আদেশ দেয়ার তিন বছর শেষ হলেও তা কার্যকর করতে পারেনি বিতরণ কোম্পানিগুলো। পরবর্তী সময়ে এক বছরের বর্ধিত সময়সীমাও পেরিয়েছে। এর পরও মিটার স্থাপন কার্যক্রম শেষ হয়নি।
সময় বাড়ানোর পরও বিতরণ কোম্পানিগুলোর এমন কালক্ষেপণের জন্য সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগকে একটি চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। সেই চিঠিতে কমিশন জ্বালানি বিভাগকে ‘টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন’ নির্ধারণ করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে গ্রাহকরা কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর না করে বাজার থেকে নিজেরাই ইভিসি মিটার কিনে লাগিয়ে নিতে পারেন।
ইভিসি মিটারে কোম্পানিগুলোর কালক্ষেপণের বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ইভিসি আমরা লাগাতে বলেছি কোম্পানিগুলোকে। তবে ন্যূনতম গ্যাসের একটা চাপ না থাকলে সব জায়গায় মিটার লাগানো যাবে না। সেক্ষেত্রে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানিগুলোকে আমরা ইভিসি বসানোর নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাড়া ইভিসি সংযোগ আমরা দিচ্ছি না। নির্ধারিত চাপ বিবেচনায় আমরা সংযোগ দেয়ার জন্য বলেছি। তবে ইভিসি মিটার লাগানোর ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় অনিয়ম রয়েছে। সেগুলো আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
গ্যাসের চাপ নির্দিষ্ট মাত্রায় সব সময় গ্রাহক পান না এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে ইভিসি মিটার স্থাপনের আদেশ দেয় বিইআরসি। ২০১৮ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ করার জন্য পাঁচটি বিতরণ কোম্পানিকে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় কমিশন। কিন্তু ২০১৮ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন না হওয়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আরো এক বছর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। সে সময়েরও দেড় বছর পেরিয়ে গেছে এরই মধ্যে।
গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, যে সময় এ আদেশ দেয়া হয়েছিল, সে সময় গ্যাসের চাপ হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। এখন গ্যাসের চাপ ভালো থাকায় ইভিসি মিটারের প্রয়োজনীয়তা গ্রাহকের কাছে খুবই কম। এছাড়া ইভিসি মিটারে কারিগরি কিছু জটিলতা থাকায় স্থাপনের কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে।
বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস কোম্পানির সূত্রে জানা গেছে, তিতাসের আওতাভুক্ত শিল্প-কারখানা রয়েছে ৫ হাজার ২৭৯টি, ক্যাপটিভ পাওয়ার রয়েছে ১ হাজার ৬৮০টি, সিএনজি ৩৯৪ ও বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে ১২ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নামমাত্র দু-চারটিতে গত পাঁচ বছরে ইভিসি মিটার স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব মিটার এখনো কার্যকর করা হয়নি। কারণ যে কয়টি শিল্প-কারখানায় ইভিসি মিটার স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নানা অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইভিসি মিটার স্থাপনে বিইআরসির যেসব শর্ত রয়েছে তা পূরণে এসব কারখানা ব্যর্থ।
গ্যাস বিতরণে আরেক কোম্পানি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় রয়েছে সাড়ে ছয় লাখ (আবাসিকসহ) গ্রাহক। এর মধ্যে শিল্প-কারখানা রয়েছে ১ হাজার ১২৭টি, বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে ২ হাজার ৮৬২ এবং বাকি প্রায় ৮০টি সংযোগ রয়েছে সার, বিদ্যুৎ ও চা বাগানে। এসব গ্রাহকের মধ্যে বড় শিল্প-কারখানা ছাড়া বাকি কোথাও ইভিসি মিটার স্থাপন করা হয়নি বলে জানা গেছে।
কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ডিভিশন) প্রকৌশলী সৈয়দ আবু নসর মো. সালেহ বলেন, যেসব গ্রাহকের লোড বেশি রয়েছে, তাদের মধ্যে আমরা ৮৫ ভাগ ইভিসি মিটার বসিয়ে ফেলেছি। এছাড়া নতুন গ্রাহকের মধ্যে যাদের লোড বেশি রয়েছে, আমরা তাদের ইভিসি মিটার দিচ্ছি। টেকনিক্যাল কিছু জটিলতা থাকায় মিটার বসানোর কাজে বিলম্ব হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করে সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানিটির আওতায় মোট পাঁচটি শিল্প, চারটি বিদ্যুৎ, দুটি ক্যাপটিভ, দুটি বাণিজ্যিক এবং ২ হাজার ৩৪৬টি আবাসিক সংযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৩৮৫টি গ্রাহক রয়েছে। তাদের মধ্যে মোট ইভিসি মিটার লাগানো হয়েছে ছয়টি। এর মধ্যে দুটি বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ইভিসি মিটারের নীতিমালায় যে পরিমাণ লোডে মিটার লাগানোর কথা বলা হয়েছে, আমরা সে কয়টি মিটার বসিয়েছি। তাছাড়া আমাদের গ্রাহক সংখ্যা কম। তবে লোড বেশি হলে আমরা গ্রাহককে ইভিসি মিটার লাগিয়ে দেব।
এদিকে ইভিসি মিটার স্থাপন না হওয়ায় শিল্প-কারখানা মালিকদের বড় একটি অংশ গ্যাস কম দিয়ে অতিরিক্ত বিল আদায় করার অভিযোগ করছে। অন্যদিকে ইভিসি মিটার বসানোয় বিতরণ কোম্পানিগুলোর অনীহা ও ধীরগতিতে প্রশ্ন তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ১৬ ভাগের মতো গ্যাস ব্যবহার করা হয় আবাসিকে। বাকি গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, চা বাগান ও সার কারখানায় ব্যবহূত হয়। মোট পাঁচটি বিতরণ কোম্পানি এসব ইন্ডাস্ট্রিতে গ্যাস সরবরাহ করে। ইভিসি মিটার না থাকার সবচেয়ে বড় অভিযোগ শিল্প-কারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ার ও সিএনজি স্টেশনগুলোর।










