আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছিল, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হামে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। আর গতকাল দেশে হামে মৃত্যু এক হাজার ছাড়িয়েছে। রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মোকাবেলা করছে।

প্রায় আট বছর ধরে দেশে হামে মৃত্যু ছিল না। ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। সে হিসেবে চলতি বছর বাংলাদেশ হাম নির্মূলের সনদ পেতে পারত। কিন্তু ভুলতে বসা সেই হাম হাজারের বেশি শিশুর প্রাণ নিয়েছে। গত বছর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা দেয়ার অবহেলাকে এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তবে মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে রোগী ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯০৪ জনের।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়। এদিন সবচেয়ে বেশি (দুজন) মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। নতুন তিন মৃত্যু নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জন। মৃতদের মধ্যে ৯০২ জন ছিলেন সন্দেহভাজন হাম রোগী। আর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০০ জন।

এদিকে সংক্রমণের পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও অনেক। এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন।

হামে বিভাগভিত্তিক এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে মারা গেছেন ৪৬৭ জন। এরপর সিলেট বিভাগে ১৫৯, রাজশাহীতে ৯৫, ময়মনসিংহে ৭৯, বরিশালে ৭৬, চট্টগ্রামে ৭৫, খুলনায় ৩৭ এবং রংপুরে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দেশে হামের এমন বিস্তারের পেছনে শিশুদের টিকাদানে দীর্ঘদিনের ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার সরবরাহে ঘাটতি এবং টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের কারণে একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি।

hum-inside.jpg

হামের সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকার বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি হিসাবে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি, প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। ফলে হিসাব অনুযায়ী কাভারেজ ১০৯ শতাংশের বেশি।

টিকা দেয়ার পরও কেন হামে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, রোগী ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ভ্যাকসিনেশনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তবে হামে আক্রান্ত রোগী ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। হাম রোগীদের চিকিৎসায় কভিডের মতো আইসোলেটেড হাসপাতালের ব্যবস্থা করা যেতে পারত, যেটা চোখে পড়েনি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সময়ে দেশে হামের টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা যায়। টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতেও বিভিন্ন সময়ে বিঘ্ন ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার এ ঘাটতি এবং নিয়মিত কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া ছেদ শিশুদের মধ্যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি করেছে। পরবর্তী সময়ে সেই ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

কেবল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করে টিকাদানের সফলতা নির্ধারণ করলে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন অনেক জনস্বাস্থ্যবিদ। কারণ লক্ষ্যমাত্রায় যদি প্রকৃত যোগ্য শিশুর সংখ্যা পুরোপুরি প্রতিফলিত না হয়, তাহলে ১০০ শতাংশের বেশি কাভারেজ থাকলেও কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যেতে পারে। একই বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের তথ্যের সঙ্গে হাম-রুবেলা টিকাদানের হিসাব তুলনা করলে শিশুর সংখ্যায় ব্যবধান পাওয়া যাচ্ছে।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের বিভিন্ন পর্যায়ে আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি।

গতানুগতিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গঠন করা প্রয়োজন। গতানুগতিক পদ্ধতিতে এ পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব নয়। শুধু টিকাদান করলেই সবকিছু কাভার করা যায় না। বিভিন্ন এলাকায় কিছু শিশু টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং তাদের মধ্য থেকেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।’

যারা এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। টিকাদানের পাশাপাশি রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে শুধু এক দফা গণটিকাদানকে যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এখনো টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকা দেয়া এবং ভবিষ্যতে যেন নতুন করে বড় ধরনের টিকাদান-ঘাটতি তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

টিকাদানের পরও আক্রান্ত ও মৃত্যু কমছে না কেন জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের প্রথমত টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা দরকার ছিল। এখনো অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। পথশিশু, যৌনপল্লীতে বেড়ে ওঠা শিশুদের টিকা দেয়া হয়েছে কিনা, সেটিও যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিকসহ এমন পেশায় যুক্ত পরিবারের শিশুরা টিকা পেয়েছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তাই তাদের সন্তানরা টিকার আওতার বাইরে থাকতে পারেন। একই সঙ্গে অন্য দেশে ব্যবহৃত হামের টিকা বাংলাদেশে কতটা কার্যকর, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে গবেষণারও প্রয়োজন রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এর একটি কারণ হতে পারে, মায়ের কাছ থেকে শিশুর যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে না পাওয়া। মায়ের হামের টিকাদান সম্পন্ন না হলে শিশুর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’