দীর্ঘদিন ধরেই মুনাফায় চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। বিশ্ববাজার থেকে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংযোজনের মাধ্যমে বিপণন করে প্রতিষ্ঠানটি। কভিড-১৯-এর অভিঘাত ও চলমান কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচির কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন লোকসানে রয়েছে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংযোজিত পণ্য বিপণন করতে গিয়ে নতুন সংকটের মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীন প্রতিষ্ঠানটি।
চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডে স্থাপিত প্রগতির গাড়ি সংযোজন কারখানার সক্ষমতা বছরে ১ হাজার ৩০০টি। নিয়মিত ৯০০ থেকে এক হাজার গাড়ি সংযোজন করে প্রগতি। বিপণনও করে প্রতি বছর প্রায় একই পরিমাণ। তবে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের হার কমে যায়। কমে যায় সরকারি কাজে গাড়ি কেনার পরিমাণও। করোনার প্রকোপ কমার পর গাড়ি বিক্রি শুরু হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডলার সংকটসহ নানা জটিলতায় কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটতে থাকে সরকার। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি কেনা ফের বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রগতির গাড়ি সংযোজন ও বিক্রি ব্যাপক পরিমাণে কমেছে। এতে প্রায় এক দশক পর চলতি অর্থবছরে লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ।
গত ৩ জুন জারি করা এক পরিপত্রে সরকার বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সব ধরনের মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এতে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকার ব্যয় সংকোচনে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কিছু খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রগতির গাড়ি বিক্রি হয়েছে ৭১১টি। এর আগে কভিডের কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে গাড়ি বিক্রি হয় মাত্র ৩৪২টি। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি গাড়ি বিক্রি করেছে মাত্র ২২টি। সরকারিভাবে গাড়ি বিক্রির নিষেধাজ্ঞা থাকায় চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার আশঙ্কা করছে বিএসইসি। এ আশঙ্কা থেকে সম্প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যূনতম সংখ্যায় হলেও গাড়ি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। তবে প্রগতির এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে প্রগতির গাড়ি বিক্রির পরিমাণ কমে লোকসানের মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রগতি করপূর্ব মুনাফা করেছে ৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৬ কোটি ২ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০১ কোটি ৩৩ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৫ কোটি ৪৯ লাখ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করপূর্ব আয় করেছে প্রগতি। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক ৯০০টি গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪৮টি গাড়ি বিক্রি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। চলতি অর্থবছরে এক হাজার গাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশই অর্জন হবে না বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির চেয়ারম্যান শহিদুল হক ভূঁইয়া এনডিসি বণিক বার্তাকে বলেন, বিএসইসির বেশ কয়েকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রগতি অন্যতম। করোনা মহামারী চলাকালেও সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রদানের পাশাপাশি লাভের ধারায় ছিল প্রগতি। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে যানবাহন ক্রয় বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরে প্রগতি কিছুটা সংকটে রয়েছে। তবে বিএসইসির একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় আগামীতে এ সংকট কেটে যাবে। প্রগতি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এটিকে দেশের অটোমোবাইল খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে।
ইংল্যান্ডের জেনারেল মোটরসের কারিগরি সহযোগিতায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডে ১৯৬৬ সালে ব্যক্তিমালিকানায় গাড়ি সংযোজন কারখানা হিসেবে গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পিআইএল) নামে জাতীয়করণ করা হয়। এরপর তা শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এটি বাংলাদেশে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি সংযোজনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা উত্তরকালে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড কোম্পানির বাস ও ট্রাক সংযোজনের মাধ্যমে পিআইএল আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে গাড়ি বিক্রির ওপর নির্ভরশীল থাকায় প্রগতি বর্তমানে লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছে। একটি টেকসই ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও প্রাধান্য দিতে হবে। বর্তমান সংকটকালেও বেসরকারি গাড়ি সংযোজনকারী কোম্পানিগুলো দেশে যেভাবে ব্যবসা করছে, সেখানে প্রগতি শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছে। এজন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিপণন দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রগতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, প্রগতির প্রধান ক্রেতা সরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে করোনাকালের সংকট কাটিয়ে প্রগতি ঘুরে দাঁড়ানোর দিকে এগিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক গাড়ি বিক্রির নিষেধাজ্ঞায় প্রগতি কিছুটা সংকটে পড়েছে। তবে দেশে সংকট কেটে গেলে প্রগতি ঠিকই আগের মতোই ঘুরে দাঁড়াবে। বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ গাড়ি তৈরির মাধ্যমে বিশ্বে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।










