রাজনৈতিক দল হিসেবে আশির দশকে যাত্রা করে বিএনপি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে দলটি। সুদীর্ঘ এ সময়ে বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব পর্যায়েই নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। মোটামুটি সব স্তরেই দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের উপস্থিতি। বাবা বা মায়ের উত্তরসূরি হিসেবে দলের বিভিন্ন দায়িত্বে আসীন হয়েছেন তারা। রাজনীতির ময়দানে এ দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের ওপরেই দলটির কর্মী-সমর্থকদের নির্ভরতা এখন সবচেয়ে বেশি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে মশিউর রহমান যাদু মিয়া, সাইফুর রহমান, কেএম ওবায়দুর রহমান, মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলামসহ অনেকেই এখন প্রয়াত। জীবিতদের মধ্যেও অধিকাংশই এখন প্রবীণ ও অশীতিপর। তাদের কেউ কেউ রাজনীতি থেকে অবসরও নিয়েছেন। প্রয়াত ও অবসরপ্রাপ্ত এ রাজনীতিবিদদের সন্তানদের অনেকেই এখন দলটির হয়ে রাজনীতি করছেন। আবার বর্ষীয়ান নেতাদের মধ্যে যারা এখনো রাজনীতি করে যাচ্ছেন, তাদের কারো কারো সন্তানও এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের এ নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন শামা ওবায়েদ, রুমিন ফারহানা, ইশরাক হোসেন, তাবিথ আউয়াল, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, নিপুণ রায়, নাসের রহমান প্রমুখ।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপিতে এখন অনেক মেধাবী তরুণ যুক্ত হয়েছেন। নানা বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা আছে। সামনের দিনে প্রযুক্তিসহ অনেক বিষয়েই আমরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হব। এসব ক্ষেত্রে নতুন এ নেতৃত্ব ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। তাদেরকে সুযোগ দেয়া হলে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপিও আরো শক্তিশালী হবে। বর্তমানে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক তরুণ রাজনীতিতে এসেছে। তবে শুধু বিএনপিই নয়, সব দলেই এখন তরুণদের গুরুত্ব দিতে হবে। এতে করে দলগুলোয় আধুনিকায়ন হবে।’
বিএনপির তৃতীয় মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত কেএম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ।
বাবার হাতেই তার রাজনীতির হাতেখড়ি। বর্তমানে তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রথম নারী হিসেবে দলটিতে এ পদ পেয়েছেন শামা ওবায়েদ। আছেন বিএনপির ফরেন রিলেশন্স কমিটির সদস্য হিসেবে। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম নামে একটি সংগঠনেরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। একাধিকবার অংশ নিয়েছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিতে অনেক নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। এখনো তৈরি হচ্ছে। যারা তরুণ প্রজন্ম তারা দেশপ্রেমিক। দলের জন্য একনিষ্ঠভাবে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। দলের কর্মী হিসেবে আমিও তাদের অংশ। যেহেতু আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাই আমি চাই গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, বাকস্বাধীনতাসহ সব বিষয় ২০২৩ সালে এসে আরো শক্তিশালী হবে। সে জন্যই বিএনপির সংগ্রাম। সে সংগ্রামে প্রত্যেকের জায়গা থেকে দলের তরুণরা একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সময়ের প্রভাবশালী সদস্য প্রয়াত তরিকুল ইসলাম। দল ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন সময়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ, সমাজকল্যাণ এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এখন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জানতে চাইলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার বাবা বরাবরই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়াই করেছেন। জীবনভর অনাচারের বিপক্ষে ও গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম করে গেছেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই ছিল উনার আদর্শ এবং সেই আদর্শের প্রতি আমৃত্যু ছিলেন। উনার সন্তান হিসেবে আমিও ঠিক সে পথটাই অনুসরণ করছি।’
দলে তরুণ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা তাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দল পরিচালনা করছেন। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরাও যে যার জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি।’
বিএনপির তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে রুমিন ফারহানা এখন বেশ আলোচনায় আছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে দলের হয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এক সময়ের বর্ষীয়ান নেতা অলি আহাদের এ উত্তরসূরি বিএনপির সহআন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। টকশো থেকে রাজনীতির মাঠ কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গন সব জায়গায়ই তার সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
জানতে চাইলে সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে রাজনীতির প্রতি শৈশব থেকেই প্রবল আগ্রহ ও নেশার মতো টান ছিল। আমার বাবা বরাবরই অ্যান্টি-স্টাবলিশমেন্ট অর্থাৎ বিরোধী দলের রাজনীতি করেছেন। ক্ষমতার রাজনীতি তিনি করেননি। এ কারণে অতীতের সব সরকারের কাছ থেকে তিনি মন্ত্রিত্বের অফার পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাই বাবার রাজনীতির সঙ্গে আমার রাজনীতি নিয়ে তুলনা হয় না। আমার রাজনীতির পেছনে প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষ যে ধরনের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য আন্দোলন করেছিল সেটি ফিরিয়ে দেয়া; যেখানে জনগণের গণতন্ত্র থাকবে, বাকস্বাধীনতা ফিরে পাবে, ভোটাধিকার ফিরে পারে এবং মানবাধিকারগুলো পূরণ করা হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনীতিটা এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেখানে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ বিরাজ করছে। মেধাবীরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে গেছে। আমার প্রচেষ্টা থাকবে ওই মানুষগুলোকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা, যাতে দেশের জন্য তারা অবদান রাখতে পারে। তবে তা একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও আমি আমার জায়গা থেকে এ রাস্তা তৈরির শ্রমিক হতে চাই।’
দলে দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় প্রজন্ম নিয়ে আমি ভীষণরকম আশাবাদী। বিএনপির তরুণরা যারা মেধাভিত্তিক কাজ করছেন অথবা অন্যান্য ক্ষেত্রে আছেন সবাই তাদের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আমরা বিরোধী দলে থাকাকালীন রাজনীতি করছি। আমরা দেশকে দেয়ার জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য যে কাজ করছি এটি আজ প্রমাণিত।’
অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রী হিসেবে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বিএনপির সহসভাপতি ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে তার ছেলে ইশরাক হোসেনও রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে লড়েছেন বিএনপির হয়ে। মাঠের রাজনীতিতেও নিয়মিত ও সক্রিয় অবস্থায় নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় তাকে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে তিনি ভোটে লড়েছিলেন। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। বর্তমানে আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে।
দেশের ১২ বার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। দলের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াত এ নেতার ছেলে নাসের রহমানও এখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। জানতে চাইলে এম নাসের রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা এক সময় দলের নেতৃত্বে ছিলেন তাদের উত্তরসূরিরা রাজনীতি করাটা স্বাভাবিক। এটি একটি প্রক্রিয়া। বিএনপির ১০ প্রতিষ্ঠাতার একজন ছিলেন আমার বাবা। এ ধারাবাহিকতায় বিএনপির রাজনীতি করাটা আমার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। গভর্ন্যান্সে আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, যা আমার জন্য সম্পদও। গত ২২ বছর আমি রাজনীতি করে আসছি। প্রথম প্রজন্ম থেকে খুব বেশিসংখ্যক নেতা নেই। দ্বিতীয় প্রজন্মের পাশাপাশি এখন তৃতীয় প্রজন্মও সামনে চলে আসছে। একই সঙ্গে তারা সামনের সারিতে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুণ রায় চৌধুরী। বর্তমানে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। তার শ্বশুর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। রাজনীতিতে আছেন গয়েশ্বর চন্দ্রের মেয়ে অপর্ণা রায়ও। তিনি বর্তমানে বিএনপির প্রান্তিক ও জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহসম্পাদক। দলের স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহর ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানও রাজনীতির ময়দানে সক্রিয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমানের ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমি এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেনও নিজ নিজ পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণরা রাজনীতিতে এখন বেশ সক্রিয়। নেতৃত্বে আসার জন্য সক্রিয়তা অনেক বড় একটি গুণ। তাদের অনেকেই দেশের বাইরে পড়াশোনা করেছেন। তারা উন্নত দেশ ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। যাদের মধ্যে এ গুণাবলি থাকবে তারাই নেতৃত্ব দেয়ার জন্য উপযোগী। ফলে তাদের আরো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি।’
তৃণমূলের রাজনীতি না করে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাওয়াকে অবশ্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক। এটি রাজনীতির জন্য শুভকর নয় বলেও উল্লেখ করছেন তারা। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি হলো পরিবারতন্ত্রের দ্বিতীয় প্রজন্ম। দ্বিতীয় প্রজন্মের সমস্যা হলো তারা তৃণমূলের রাজনীতি করে বড় হয়নি। এটি খুব সহজভাবে দেখার কিছু নেই। সব দলেই এবং সব জায়গায় এখন পারিবারিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে করে সত্যিকারের রাজনৈতিক মানুষ, যারা তৃণমূল থেকে উঠে আসছেন তারা নেতৃত্বে আসতে পারেন না। মূলধারার দলগুলোয় এ প্রবণতা রাজনীতির জন্য ভালো নয়।’










