বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের নিরিখে ভোগ্যপণ্য ধরা হয় নয়টি পণ্যকে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন প্রধান চাহিদা অনুযায়ী চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, আটা, ময়দা, লবণ ও দুধ রয়েছে এ তালিকায়। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের হিসাবে চাহিদার সংখ্যা কিছু বেশি। এর মধ্যে প্রধান ভোগ্যপণ্য হিসেবে ধরা হয় চাল, চিনি, গম, ডাল ও ভোজ্যতেলকে। দেশের বাজারে অতিপ্রয়োজনীয় এ পণ্যগুলো নিয়েই কারসাজি, মজুদ, দাম বাড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে যেসব নিত্যপণ্য আমদানি করতে হয়, সেগুলো নিয়ে কারসাজির পরিমাণও বেশি।

এসব নিয়ন্ত্রণে আমদানিনির্ভর অতি নিত্য ভোগ্যপণ্য বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় মজুদ প্রতিরোধ, কারসাজি করে মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি আইন প্রণয়ন করে। ২০১১ সালে জারি হয় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) প্রথা বাতিল করা হয়। সারা দেশে অঞ্চলভিত্তিক ডিলার নিয়োগ ও সমানুপাতে আমদানি করা পণ্য বিপণনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে শুরু থেকেই অনীহা ছিল ব্যবসায়ীদের। বাস্তবায়নকারী সরকারি সংস্থাগুলোকেও তেমন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে আইন প্রণয়ন হলেও বন্ধ হয়নি অতি নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে কারসাজি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন প্রণয়নের পর সংশ্লিষ্টরা কিছুদিন এটি মেনে চলার ভান করেন। তারপর একসময় সব পক্ষই এ আইনের কথা ভুলে যায়। বিশেষ করে সংকট কিংবা পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে বাজার তদারকিসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। তবে এ সবই সাময়িক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়। যার কারণে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশটি।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ২১ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এসআরও নং ৬৩-আইন/২০১১-এর মূলে আদেশটি জারি করা হয়। তার আগ পর্যন্ত শতবর্ষী ডিও প্রথার মাধ্যমে আমদানীকৃত কিংবা যেকোনো ভোগ্যপণ্য বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সরবরাহ হতো। ডিও স্লিপের কারবারিতে মুষ্টিমেয় বড় ব্যবসায়ী জড়িত থাকায় হাতবদলের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায় কিংবা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছতে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যেত। সরকারিভাবে এ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হওয়ায় আইনের মাধ্যমে অতি নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। যদিও শুরু থেকেই ব্যবসায়ীরা এ আইনের বিপক্ষে ছিলেন। পরে তারা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে আইনটিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিও প্রথা বাতিলের মাধ্যমে সরকার ২০১১ সালের আইনে প্রধান ভোগ্যপণ্য অর্থাৎ চাল, চিনি, গম ও ভোজ্যতেলের বাজার থেকে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বিতাড়িত করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনো সংস্থাই এ আইন বাস্তবায়নে মনোযোগী না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের ভোগ্যপণ্যের তদারকি ব্যবস্থা।

এ বিষয়ে দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও বিপণন প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স ও অপারেশন) মো. শফিউল আতহার তাসলিম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের পণ্যের বিপণন ব্যবস্থাপনা এখনো আধুনিক বিশ্বের মতো উন্নত হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতায় ডিলারশিপের মাধ্যমে খোলা ও বৃহৎ আকারে পণ্য সরবরাহ ও বিপণন কার্যক্রম শতভাগ চালু করতে পারেনি কোম্পানিগুলো। ভোগ্যপণ্য ছাড়াও আমাদের আরো অনেক ব্যবসা রয়েছে। অথচ শুধু ভোগ্যপণ্য ব্যবসার জন্য আমাদের দোষী হতে হয়। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে আমাদের দায় নগণ্য। এজন্য সরকারি নির্দেশনা ও নৈতিক জায়গা থেকে আমরা দেশব্যাপী ডিলারশিপের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের কাজ শুরু করেছি।

এসআরও আদেশে বলা হয়েছে, একজন ব্যবসায়ী বা আমদানিকারক পণ্যগুলো একক বা একাধিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আগে ডিও বিক্রি করে আগাম অর্থ উত্তোলন করলেও এ নিয়মে এসও অর্থাৎ সরবরাহ আদেশের মাধ্যমে পণ্য বিপণন করতে হবে। দেশব্যাপী কোম্পানিগুলোর নিবন্ধিত ডিলার প্রতিষ্ঠান থাকবে। আনুপাতিক হারে আমদানীকৃত কিংবা উৎপাদিত পণ্য ডিলারদের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি এসও বাজারে ছেড়ে দেয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে ডিলার প্রতিষ্ঠানকে পণ্য উত্তোলন করতে হবে এবং এসওর গায়ে পণ্যের দাম নির্ধারিত করে লিপিবদ্ধ থাকবে। কোম্পানিগুলো নিয়োগকৃত ডিলারের তালিকা সংশ্লিষ্ট উপজেলা কিংবা জেলা প্রশাসনের কাছে প্রেরণ করবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসক এ-সংক্রান্ত গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে সার্বিক বিষয়টি তদারক করবে।

আদেশ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পণ্যের দাম লেখা বাধ্যতামূলক বলা হলেও এখনো বাংলাদেশের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর বিক্রি করা এসওতে কোনো দাম লেখা নেই। ১৫ দিনের মধ্যে অবশ্যই মিলগেট থেকে পণ্য উত্তোলনের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হলেও বছরের পর বছর এসব এসও পাইকারি বাজারে বারবার হাতবদল হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের কথা থাকলেও এ নির্দেশনা মানছেন না ব্যবসায়ীরা। নিয়োগ পাওয়া ডিলার কিংবা ডিলার বাতিলের বিষয়টি উপজেলা কিংবা জেলা কমিটিকে জানানোর কথা থাকলেও সেটি এখন আর প্রতিপালন করেন না ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আদেশটির যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা কমছে না। আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা যেমন আইনটি মানছেন না, তেমনি এটাও ঠিক যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেভাবে তদারক করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ও দাম নিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কারসাজির বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। আইনটিকে আরো বেশি যুগোপযোগী করে ডিলারশিপের মাধ্যমে শতভাগ পণ্য বিপণন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারকে ঢেলে সাজাতে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

দেশের বেশ কয়েকটি জেলা প্রশাসন কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ-২০১১-এর বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয় বণিক বার্তার পক্ষ থেকে। অধিকাংশ সরকারি কার্যালয়ের দায়িত্বশীলরা এ আইনের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে কেউ কেউ আইন সম্পর্কে জানলেও তা কার্যকর নয় বলে স্বীকার করেছেন। যেমন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি। আইনের বিষয়টি জেনে পরবর্তী সময়ে মন্তব্য করতে পারবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার ইউনুস জানান, ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্দেশনায় নানা কার্যক্রম স্থানীয় প্রশাসন হিসেবে বাস্তবায়ন করছেন তারা। তবে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আইনের বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ে কোনো কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয় না। এ-সংক্রান্ত কোনো মনিটরিং টিম গঠন বা বৈঠক হয় না।

আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে মূলত চাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও গমের বাজার নিয়েই কারসাজির সুযোগ থাকে সবচেয়ে বেশি। চিনি, ভোজ্যতেল ও গম প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৃহৎ ব্যবসায়ী পণ্য আমদানি করে একজন কিংবা কয়েকজন ট্রেডিং ব্যবসায়ীর কাছে পণ্যটি বিক্রি করে দেন। ২০১১ সালের আইন অনুসারে আমদানিকারকের দেশব্যাপী জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিবন্ধিত ডিলার ব্যবসায়ী থাকবেন। একজন আমদানিকারক এক জাহাজ পণ্য আনলে আনুপাতিক হারে সারা দেশের তার নিবন্ধিত ডিলারকে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। এতে একজন বা কয়েকজন ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ করে দাম বাড়ানো বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারবেন না। তবে সরকার ডিও প্রথা বাতিল করে নতুন আইন করলেও খাতুনগঞ্জসহ দেশের প্রধান প্রধান পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ট্রেডিং ব্যবসায়ীরা প্রত্যেকেই নামে-বেনামে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। এরপর বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ নেয়ার মাধ্যমে সরকারের নতুন এ আইনকে কার্যত অচল করে দেয়া হয়।