আমনের ভরা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সারের সংকট। দোকানে দোকানে ঘুরেও সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। যা-ও মিলছে, কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত দামে। সরকারের পক্ষ থেকে সারের সংকট নেই দাবি করা হলেও ইউরিয়া সারের দাবিতে অনেক জায়গাতেই কৃষকরা বিক্ষোভ সমাবেশ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) পরিচালিত রংপুরের বাফার গুদামে প্রায় ১১ বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে ১ হাজার ৫৫০ টন ইউরিয়া সার।

দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকায় বেশির ভাগ বস্তাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শক্ত হয়ে জমাট বেঁধেছে সারগুলো। তাই এসব সারের মান ঠিক আছে কিনা, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। সম্প্রতি কয়েক দফায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্স ১৭৫ টন মানহীন সার সরবরাহ করায় সেই উদ্বেগটা আরো দানা বেঁধেছে। বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, ইউরিয়া সার সাধারণত নষ্ট হয় না। কোনো কারণে জমাট বেঁধে গেলে তা ক্রাশ করে ব্যবহার করা যায়। তাই নতুন বস্তায় ভরে সারগুলো দ্রুতই বাজারে ছাড়া হবে।

রংপুর বাফার গুদাম সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১১-১২, ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বিপরীতে যে সার সরবরাহ করা হয়েছিল এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫০ টন অগ্রহণযোগ্য। কেননা কোনো বস্তায় ১০ কেজি, আবার কোনোটিতে ৩৫-৪০ কেজি পর্যন্ত সার কম ছিল। তাই বিষয়টি সমাধানে একাধিকবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তত্কালীন চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের নূর ট্রেডিং কোম্পানিকে অবগত করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। তাই দীর্ঘদিন ধরে ইউরিয়া সারগুলো গুদামে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অবশেষে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বিসিআইসি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শক্ত, জমাট বাঁধা ও ছেঁড়াফাটা বস্তা ক্রাশ করে নতুন বস্তাভর্তি করতে টেন্ডার আহ্বানের জন্য যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডকে দায়িত্ব দেয়া হয়। নিয়ম মেনে সেই কাজ পেয়েছে মেসার্স রাজ্জাক অ্যান্ড ব্রাদার্স। এখন পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় আট হাজার বস্তায় সার ভরা হয়েছে। এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারির জন্য বরাদ্দের ১৭৫ টন সারও নতুন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্স দীর্ঘ আট মাস পর রংপুরের বাফার গুদামে সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ জাহাজ থেকে খালাসের পর সেগুলো ৫০ দিনের মধ্যে গুদামে সরবরাহের কথা ছিল। গুদাম সূত্র জানায়, ১১, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর তিন দফায় সরবরাহ করা ইউরিয়া সারের বস্তা এরই মধ্যে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। তাই এর মান নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

প্রশ্নবিদ্ধ সার সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে পোটন ট্রেডার্সের প্রতিনিধি মো. মাসুদার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পাঁচ-ছয় মাস আগে মোংলা বন্দর থেকে সারের বস্তাগুলো বাঘাবাড়ীতে বিভিন্ন পয়েন্টে গুদামে ডাম্পিং করে রাখা হয়েছিল। এখানে সরবরাহকৃত সারগুলো শেষের দিকের হওয়ায় বস্তাগুলো লালচে হয়ে গিয়েছে। রংপুর বাফার গুদাম কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, নতুন বস্তায় সার ভরে না দিলে তারা তা বিধি অনুযায়ী গ্রহণ করবে না। তাই এক সপ্তাহের মধ্যে বস্তা পরিবর্তন করে দেব আমরা।

এসব বিষয়ে বাফার গুদামের উপব্যবস্থাপক ও ইনচার্জ ফয়সাল আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমার আগের ইনচার্জ মুকুল মিয়া দায়িত্বে থাকার সময়ের ঘটনা এটি। মামলার আলামত হিসেবে এটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময়েও এর সমাধান কেন হয়নি জানতে চাইলে ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। অবশেষে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা সারগুলো নতুন করে বস্তাভর্তি করতে অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। তবে এখনো বিক্রির অনুমতি পাওয়া যায়নি। সদ্য সরবরাহকৃত সারের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন বস্তায় সার ভরে দিতে এরই মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে জানতে চাইলেও বস্তায় থাকা সারের মানের বিষয়টি এড়িয়ে যান এ কর্মকর্তা।

বিভাগীয় গবেষণাগার, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট রংপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আইয়ুব-উর-রহমান অবশ্য বলেন, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের কোনটি কতদিন ভালো থাকবে, তা অবশ্যই উল্লেখ করা থাকে। সারের মেয়াদের বিষয়টি যদিও আমার জানা নেই। তবে ইউরিয়া সার কোনো কারণে জমাটবদ্ধ হয়ে গেলে তা আবার ক্রাশ করে ব্যবহার করলে এর গুণগত মানের কোনো তারতম্য হয় না। ড. আইয়ুব-উর-রহমানের বক্তব্যের সূত্র ধরে পরে বাফার গুদামের ইনচার্জ মো. ফয়সাল আহম্মেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউরিয়া সার কতদিন পর্যন্ত ভালো থাকবে, এর নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ উল্লেখ থাকে না।

উপাদানগতভাবে ইউরিয়া সার পরিবর্তনশীল বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন যদি কোনো গুদামে ইউরিয়া সার ফেলে রাখা হয়, তাহলে সেগুলোয় কিছু ‘সিস্টেম লস’ হতে পারে। ফলে সারের ওজন কমে যেতে পারে। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ১০ কেজি সার দীর্ঘ সময় ফেলে রাখলে সেগুলোর ওজন এক থেকে তিন কেজি পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইউরিয়া সারের রাসায়নিক অন্য কোনো রাসায়নিকে পরিবর্তিত হওয়ারও শঙ্কা থাকে। তবে এটা নির্ভর করে সারগুলো কোন অবস্থায়, কীভাবে রাখা হচ্ছে তার ওপর। আবার রাসায়নিক উপাদান পরিবর্তিত হওয়া সার ব্যবহারের ফলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে। এজন্য গুদামে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা সার বাজারজাত করার আগে সঠিকভাবে গুণগত মান যাচাইয়ের পরামর্শ দেন তিনি।

রংপুর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান সার গুদামে থাকার বিষয়টি যখন অবগত হয়েছি তখন থেকেই সেগুলো ব্যবহার উপযোগী করার পরিকল্পনা নিয়েছি। অবশেষে সেই অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। পোটন ট্রেডার্সের সরবরাহকৃত সারের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারের মান যাচাইপূর্বক সঠিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এরই মধ্যে বাফার গুদামের ইনচার্জকে নির্দেশ দিয়েছি।

রংপুর কৃষিনির্ভর জেলা। প্রতি বছর এখানে প্রচুর ধান ও আলুসহ সারনির্ভর একাধিক ফসলের চাষাবাদ হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ জেলায় ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে ৭৬ হাজার ৩৫ টন। চলতি সেপ্টেম্বরে সারের চাহিদা পীরগঞ্জ উপজেলার বিশেষ বরাদ্দ ৫০০ টনসহ মোট ৬ হাজার ২৮১ টন। এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে ৩ হাজার ৯৪১ টন। গুদামে মজুদ আছে ১ হাজার ৯০০ টন। এছাড়া নতুন করেও সার ডুকছে বাফার গুদামে।