২০১০ সালে ধসের পর গত নয় বছরে পুঁজিবাজার থেকে ৯২টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে নয়টি কোম্পানি রয়েছে যেগুলো বাজার থেকে ৪৯৯ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেও ব্যবসায়িক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। উল্টো পুঁজিবাজারের সবচেয়ে মন্দ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রশ্ন উঠেছে, আইপিও-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ব্যর্থতার কারণে কি কোম্পানিগুলোর এমন অধোগতি হয়েছে? নাকি কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে?
পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেও যেসব কোম্পানির পারফরম্যান্সে অধোগতি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কিংবা বিশেষ নিরীক্ষা হয়নি। যার ফলে প্রকৃত কারণ এখনো অনুদঘাটিতই রয়ে গেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আইপিও ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের পরও কোনো কোম্পানির অবস্থার উন্নতি না হয়ে অবনতি হলে সে কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে স্বাভাবিকভাবে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়ে থাকে। যদিও আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা, নিরীক্ষক, ইস্যু ব্যবস্থাপক, অবলেখক ও স্টক এক্সচেঞ্জও দায় এড়াতে পারে না এক্ষেত্রে। পাশাপাশি বাছবিচার না করেই বিনিয়োগ করায় বিনিয়োগকারীদেরও দায় থাকে কিছুটা।
পুঁজিবাজার থেকে নেয়া অর্থ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হবে—আইপিওতে আসার সময় বিনিয়োগকারীদের এমন আশা দেখিয়েছিল বর্তমানে সবচেয়ে মন্দ অবস্থায় থাকা নয়টি কোম্পানি। কিন্তু প্রবৃদ্ধি দূরের কথা, এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের লোকসানে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সবক’টি প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারের সবচেয়ে মন্দ ও নন পারফর্মিং কোম্পানি হিসেবে বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। বর্তমানে কোম্পানিগুলোর শেয়ার আইপিওকালীন ইস্যু মূল্যের চেয়ে অনেক কমে লেনদেন হচ্ছে।
আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেও ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা এই নয় কোম্পানির মধ্যে রয়েছে জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফ্যামিলিটেক্স (বিডি), এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং এবং সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল। এর মধ্যে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, ফ্যামিলিটেক্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, অ্যাপোলো ইস্পাত, এমারাল্ড অয়েল, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলের তালিকাভুক্তির বিষয়ে কমিশনের কাছে নেতিবাচক সুপারিশ করেছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিএসইসি এ কোম্পানিগুলোর আইপিও অনুমোদন দিয়েছে। অতীতে আইপিওতে আসতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর কার্যালয় ও কারখানা পরিদর্শনে যেতেন বিএসইসির কর্মকর্তারা। কিন্তু সমালোচনা এড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই এটি বন্ধ রয়েছে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতির কারণে এক্ষেত্রে কমিশনের কিছু ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে রুবাইয়াতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক অবস্থা কী কারণে খারাপ হয়েছে সেটি আমরা কেস টু কেস ভিত্তিতে দেখব। এক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার বিষয়ে আমরা প্রাধান্য দেব। যেহেতু কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে চলে এসেছে এবং এর সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত রয়েছে তাই আমরা কোম্পানিগুলোকে নার্সিং করে অবস্থা পরিবর্তন করা যায় কিনা সে চেষ্টা করব।
২০১১ সালে পুঁজিবাজার থেকে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ১৫ টাকা প্রিমিয়ামে ৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে বস্ত্র খাতের কোম্পানি জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। উত্তোলিত অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানটি। আইপিওতে আসার সময় ভালো ব্যবসা ও মুনাফা দেখালেও সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে ১৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে কোম্পানিটির। ফলে গত বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশই দিতে পারেনি তারা। আর সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকেও লোকসানে রয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৬০ পয়সা।
২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের আরেক কোম্পানি জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস লিমিটেড। আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৩০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছিল কোম্পানিটি। সংগৃহীত অর্থে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করে তারা। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে এর আগের বছরে তুলনায় কোম্পানিটির মুনাফা ৫৩ শতাংশ কমে ২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়নি তারা। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ২ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর রাইট শেয়ার ইস্যুর অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের কারণে কোম্পানিটির পরিচালকদের জরিমানা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে শেয়ারপ্রতি ১২ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে ২২০ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত নতুন এনওএফ প্লান্ট স্থাপন ও ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছিল কোম্পানিটি। কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির সময় তত্কালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিএসইসিকে চিঠি দিয়ে আইপিও অনুমোদন না দেয়ার অনুরোধও করেছিলেন । তা সত্ত্বেও কমিশন কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন করে। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে পারেনি। এমনকি আলোচ্য বছরের আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি। এর আগের ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে মাত্র ২ কোটি টাকা মুনাফা করলেও সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। বর্তমানে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ৩ টাকা।
বাজার থেকে মূলধন তুলে অবস্থার উন্নতি করতে না পারা কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আইপিও প্রক্রিয়ার সঙ্গে কয়েকটি পক্ষ জড়িত। সবার প্রথমে দায় রয়েছে যে নিরীক্ষক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে। তারপর যে ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল তার দায় রয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির প্রসপেক্টাস পরীক্ষা করে থাকে। তারও দায় রয়েছে। আর সবশেষে আইপিওর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া বিএসইসির দায় রয়েছে। এখানে সব পক্ষকেই সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাছাড়া যেসব কোম্পানির পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে সেগুলোর কারণ উদঘাটনের উদ্যোগ নেয়া উচিত কমিশনের। এক্ষেত্রে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অবশ্য বিতর্ক এড়াতে বিএসইসির কর্মকর্তাদের আইপিও কোম্পানি পরিদর্শনে না যাওয়ার বিষয়টি সমর্থন করছেন তিনি। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের বাছবিচার না করেই আইপিওতে আসা সব কোম্পানিতে বিনিয়োগের প্রবণতা পরিহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৩ সালে। আইপিও ছেড়ে বাজার থেকে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৪৫ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে তারা। মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, লিজিং ও পুনঃঅর্থায়নের ক্ষেত্রে আইপিওর অর্থ ব্যয় করেছে কোম্পানিটি। তালিকাভুক্তির পরের বছরই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়নি। লভ্যাংশ দেয়নি ২০১৭ ও ২০১৮ হিসাব বছরেও। সর্বশেষ ২০১৯ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। বর্তমানে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ২ টাকা ৪০ পয়সা।
২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেড ১০ টাকা ফেস ভ্যালুতে ৩৪ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে। উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করেছিল কোম্পানিটি । টানা তিন বছর ধরেই লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে গত বছর কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে নামমাত্র মুনাফা করেছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে বর্তমানে মাত্র ৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বর্তমানে এর শেয়ারদর ১ টাকা ৮০ পয়সা।
২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এ সময় বাজার থেকে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ২০ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে কোম্পানিটি। আইপিওর এই অর্থ চলতি মূলধন ও ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে তারা। বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় কোম্পানিটির কয়েকজন পরিচালক পলাতক রয়েছেন। তিন বছর ধরেই উৎপাদন বন্ধ থাকা এই কোম্পানি থেকে লভ্যাংশও পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৯ টাকা ৫০ পয়সা।
একই বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আইপিওর মাধ্যমে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে তারা। উত্তোলিত অর্থের ৭৬ শতাংশ যন্ত্রপাতি কেনা ও ভবন নির্মাণ, ব্যাংকঋণ পরিশোধে প্রায় ১০ শতাংশ এবং চলতি মূলধন বাবদ প্রায় ৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে কোম্পানিটি। ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরেই কোম্পানিটির মুনাফা কমছে। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মুনাফা করলেও ওই বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি কোম্পানিটি। সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। বর্তমানে এর শেয়ারদর ৬ টাকা ১০ পয়সা।
২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৩৫ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। সংগৃহীত অর্থের প্রায় ৪৬ শতাংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধ, মূলধনি বিনিয়োগ ৩৩ শতাংশ এবং চলতি মূলধন খাতে ১৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে কোম্পানিটি। ২০১৬-১৭ হিসাব বছর থেকেই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না। কয়েক বছর ধরেই কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ। ডিএসইর পক্ষ থেকে গত বছর কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় ও কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। বর্তমানে এর শেয়ারদর ১ টাকা ৯০ পয়সা।
২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৪৫ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করে। উত্তোলিত অর্থের প্রায় ৬৯ শতাংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধ আর ২৭ শতাংশ ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় করা হয়। তালিকাভুক্তির পরের বছর থেকেই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। তিন বছর ধরেই কোম্পানিটির কারখানা বন্ধ রয়েছে। ডিএসইর পক্ষ থেকেও গত বছর পরিদর্শনে গিয়ে এর কার্যক্রম বন্ধ পাওয়া যায়। বর্তমানে এর শেয়ারদর ১ টাকা ৭০ পয়সা।
আইপিওর ক্ষেত্রে প্রথমেই কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের দায় রয়েছে বলে মনে করেন বিএসইসির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, যেহেতু কোম্পানির ম্যানেজমেন্টই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে সেহেতু তাদের দায় যেমন আছে তেমনি যে নিরীক্ষক এটি নিরীক্ষা করেছেন তার দায়ও রয়েছে। নিরীক্ষকের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরীক্ষক যদি সঠিকভাবে নিরীক্ষা না করে তাহলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন স্বচ্ছ হবে না। আবার কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট যদি আর্থিক প্রতিবেদনে সঠিক তথ্য না দেয় তাহলে নিরীক্ষকের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইস্যু ব্যবস্থাপক ও অবলেখকরাও কিন্তু কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে থাকে। তাই আইপিওর ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কোম্পানির আইপিওর বিষয়ে সন্দেহ হবে সেগুলোর ক্ষেত্রে কমিশন নিজে কিংবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় নিরীক্ষা ফার্মের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে পারে। তাছাড়া আইপিও অনুমোদনের আগে বিএসইসির কর্মকর্তাদের কোম্পানি পরিদর্শনের বিষয়টিও বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক হিসাবমান ও প্রচলিত আইন অনুসারে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে কিনা সেটি দেখার দায়িত্ব এফআরসির। সম্প্রতি সার্কুলারের মাধ্যমে জনস্বার্থ সংস্থার আওতার মধ্যে কারা পড়বে সেটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠানই এফআরসির নজরদারির মধ্যে চলে আসবে। এ বিষয়ে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ এফসিএ বণিক বার্তাকে বলেন, তালিকাভুক্ত কিংবা অতালিকাভুক্ত যে ধরনের প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন সেখানে যদি জনসাধারণের স্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে সেসব কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়টি আমাদের কার্যপরিধির মধ্যে পড়ে। আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিষয়টি নিয়ে বিএসইসির সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। বিএসইসি তাদের মতো করে এ বিষয়টি দেখছে। আমরাও আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। করোনা না থাকলে এতদিনে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতো। তবে আশা করছি ছয় মাসের মধ্যেই অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।










