সারা দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজনে সামাজিক ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচি চলমান। এ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কাবিখা, কাবিটা, খাদ্যশস্য বা আর্থিক সহায়তা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বান্দরবানের সাত উপজেলায় প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ১৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় রুমা উপজেলার থোয়াইবতং নতুন পাড়া থেকে তংমক পাড়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি কাঁচা সড়ক নির্মাণের কথা ছিল। একই সড়ক হলেও দুই প্যাকেজে কাজটি করার কথা। এর মধ্যে থোয়াইবতং নতুন পাড়ার সড়কের কাজ চলমান। তবে তংমক পাড়ায় এখনো কাজই শুরু হয়নি।

এছাড়া মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে কর্মসূচির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৃতীয় পর্যায়ে রুমা উপজেলার চার ইউনিয়নের জন্য ৩৮ দশমিক ৬২৪ টন চাল ও সমপরিমাণ গম বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দের বিপরীতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশিকা পাননি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা।

তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস থেকে কাবিখা প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নসংক্রান্ত কোনো নোটিস দেয়া হয়নি। আগামীকাল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শুরু হচ্ছে। অবশ্য প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুসরণ করে করা হয়।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র বলছে, গত জানুয়ারিতে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় বান্দরবানের সাত উপজেলার প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির জন্য ১০ কোটি ৯৭ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা ও ৭৮৩ টনের বেশি গম বরাদ্দ দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কাবিখা-১)। যার বিপরীতে ১৫ মার্চের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে নির্দেশনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে এ কর্মসূচির আওতায় তৃতীয় পর্যায়ের বরাদ্দে রুমা উপজেলার চার ইউনিয়নের জন্য ৩৮ দশমিক ৬২৪ টন চাল ও সমপরিমাণ গম বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দের বিপরীতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কাজ ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলা কর্ণধার কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদস্য সচিব পিআইও। ইউনিয়ন পরিষদ কমিটিও রয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঠানো প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোয়ও আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রুমা উপজেলায় চারটি ইউনিয়ন রয়েছে। রুমা সদর, রেমাক্রি প্রাংসা, পাইন্দু ও গেলেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদ। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। নির্দেশিকা অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ শেষ হয়েছে ওই দুই পর্যায়ে গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজের সময়কাল।

এ বিষয়ে পাইন্দু ইউনিয়ের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মংছো মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাবিখা প্রকল্পে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের বরাদ্দের বিপরীতে একটি কাঁচা সড়ক নির্মাণের অনুমোদন দেয় উপজেলা প্রশাসন। থোয়াইবতং নতুন পাড়া থেকে তংমক পাড়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সড়ক নির্মাণ করার কথা। একই সড়ক হলেও সেটি দুটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এক ভাগের কাজে আমাকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করেছে পিআইও অফিস। অন্যটির সভাপতি ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার অংমেসিং মারমা। দুটি কমিটিতে ১০ জনের জায়গায় ১১ জন সদস্য রয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে পিআইও অফিসের অফিস সহকারী জিফঙ্কর চাকমা আমাকেসহ দুই প্রকল্প সভাপতির কাছে ৩ লাখ করে ৬ লাখ টাকা বুঝিয়ে দিয়েছেন। কাজ শেষে বাকি টাকা দেয়া হবে।’

এদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের মতো তৃতীয় পর্যায় বরাদ্দসংক্রান্ত নোটিস দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা। একইভাবে তৃতীয় পর্যায়ে বরাদ্দের নোটিস পাননি বলে জানিয়েছেন রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিরা বম ও গেলেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো। তৃতীয় পর্যায়ে বরাদ্দের বিষয়ে জানা নেই বলে জানিয়েছেন পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ২০ শতাংশ উপজেলা পরিষদে রিজার্ভ রেখে বাকিগুলো ইউনিয়ন পরিষদে ভাগ করে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন রুমা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. কাউছার আলী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নোটিস দেয়া হোক বা না হোক বরাদ্দের বিপরীতে প্রকল্পের কাজগুলো রুমাতেই করা হচ্ছে।’

তবে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান চৌধুরী বলেন, ‘বরাদ্দ দেয়া হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুকূলে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের অনুকূলে নয়। এছাড়া উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভা ও উপজেলা কর্ণধার কমিটির সভায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত থাকেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি মনে করেন, তাহলে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রকল্প চেয়ারম্যান করতে পারবেন।’

অবশ্য প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের মতো অন্য ছয় উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলো নোটিস পেয়েছে। রুমা উপজেলার চার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নোটিস না পাওয়া প্রসঙ্গে আদনান চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো নোটিসে (তৃতীয় পর্যায় বরাদ্দ) স্বাক্ষর করেছি। নোটিস না পাওয়ার তো কথা নয়।’