বিদেশী ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ব্যবসায়ীদের দেয়া ঋণ নবায়ন করতে চাইছে না। বিদেশী ঋণের প্রবাহ কমেছে দেশের বেসরকারি খাতে। এর মধ্যেও বিদেশী উৎস থেকে ঋণ বেড়েছে সরকারের। গত বছরের শেষ ছয় (জুলাই-ডিসেম্বর) মাসে সরকারের বিদেশী ঋণ বেড়েছে ১০৬ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ২০২২ সালের জুনের তুলনায় ডিসেম্বরে দেশের বিদেশী ঋণের পরিমাণ ১৪৩ কোটি বা ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার কমেছে। বিদেশী ঋণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশী উৎসের ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যমান ডলার সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুন শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে মোট বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বর শেষে বিদেশী উৎসের এ ঋণের পরিমাণ ৯৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিদেশী এ ঋণের মধ্যে ৬৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার সরকারের। গত বছরের জুনে সরকারের বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৯ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ওই ছয় মাসে সরকারের বিদেশী ঋণ প্রায় ২১ কোটি ডলার বেড়েছে।
২০২২ সালের জুন শেষে দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত বছরের শেষ ছয় মাসে ব্যবসায়ীদের বিদেশী ঋণ কমেছে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৮১ কোটি ডলার কমেছে। আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমেছে ৩০ কোটি ডলার। মূলত বিদেশী উৎস থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের ডেফার্ড পেমেন্ট, ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে।
ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ডলারের তীব্র সংকট চলছে। অনেক ব্যবসায়ী ও ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে বিদেশী ঋণ ও এলসি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে চেয়েছে। অনুরোধ সত্ত্বেও কিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ নবায়ন করেনি। এ কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। চলতি বছরেও স্বল্পমেয়াদি অনেক ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হবে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঋণ নবায়ন না করলে দেশে ডলার সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নেয়া ব্যবসায়ীদের বিপদ আরো বাড়বে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুুবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘কভিড-১৯-এর সময় আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার সর্বনিম্নে নেমে এসেছিল। এ কারণে ব্যবসায়ীরা দেশের ব্যাংকের তুলনায় বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এখন বিশ্ববাজারে সুদের হার চড়া। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। এ কারণে বিদেশী ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় বিনিয়োগে উৎসাহ দেখাচ্ছেন।’
বাংলাদেশের বিদ্যমান ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার প্রভাবেও বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়াচ্ছে বলে জানান সৈয়দ মাহবুুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কভিডের সময় দেশের অনেক বিদেশী ঋণ ও এলসি দায় নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজে থেকেই ঋণ নবায়ন করে দিয়েছিল। এখন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছে। নবায়নে রাজি না হলে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা সে ঋণ পরিশোধ করে দিচ্ছেন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতের নেয়া বিদেশী ঋণের মধ্যে ১১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ট্রেড ক্রেডিট বা বাণিজ্যভিত্তিক ঋণ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার হলো বায়ার্স ক্রেডিট। মূলধনি পণ্য ও সেবা আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা বিদেশী ব্যাংক থেকে এ ঋণ নিয়েছেন। বাকি ঋণের ৯০ কোটি ডলার বিদেশী ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং ৬৯ কোটি ডলার ডেফার্ড পেমেন্ট বা বিলম্বিত দায়। সরাসরি স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে বিদেশী ব্যাংক থেকে ৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ এসেছে। সব মিলিয়ে বিদেশী উৎস থেকে দেশের বেসরকারি খাতের নেয়া ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর, যা বেসরকারি খাতের মোট বিদেশী ঋণের ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বেসরকারি খাতের নেয়া বিদেশী ঋণের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশের মেয়াদ এক বছরের বেশি। ডলারের হিসাবে এ ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের শেষ ছয় মাসে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৮০ কোটি ডলার কমেছে। এর মধ্যে ৩২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার কমেছে ডেফার্ড পেমেন্ট। বিদেশী ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায়ও ২৭ কোটি ডলার কমেছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ হওয়ায় এ ঋণের পরিমাণ কমেছে ৩০ কোটি ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশী উৎস থেকে নেয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ পরিশোধ নিয়ে গত বছরের শুরু থেকেই চাপ ছিল। এ চাপের কারণেই দেশে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের মধ্যেই বেসরকারি খাতের প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। সরকারি খাতেরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে মাত্র এক বছরের মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই তৈরি হয়নি। তবে এরই মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ বিদেশী ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। বিদেশী ব্যাংক ঋণের মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হলে সে ঋণ পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে। তবে ঠিক কত পরিমাণ বিদেশী ঋণ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা হয়েছে, সে পরিসংখ্যান বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া যায়নি।
প্রায় একই তথ্য জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হকও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতের কিছু ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বিদেশী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ঋণের মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হলে সেগুলো পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা রফতানি আয় থেকে বিদেশী ঋণ পরিশোধ করেছেন। ঋণের মধ্যস্থতাকারী দেশী ব্যাংকগুলোও এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে।’
বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ কমে আসার সময়ে সরকারের বিদেশী ঋণ বেড়েছে ২০ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। তবে এ সময়ে সরাসরি সরকারের ঋণের পরিমাণ ১০৬ কোটি ডলার বেড়েছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশী ঋণ ৮৬ কোটি ডলার কমে আসায় সরকারের মোট বিদেশী ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ কিছুটা কম দেখাচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছে সরকার। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা দেয়ার প্রস্তাব পাস হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ পেতে সরকার বিপুল তত্পরতা চালাচ্ছে। সে হিসেবে আগামী বছরগুলোয় সরকারের বিদেশী ঋণ অনেক বাড়বে বলেই পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৩ সাল শেষে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণের পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০২৪ সাল শেষে বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে করা এক পর্যবেক্ষণে সরকারি-বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণ নিয়ে এ পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের তৈরি করা ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট মুভমেন্ট’ শীর্ষক প্রকাশনায় এ পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়।










