দেশের অন্যতম সুতা উৎপাদনকারী একজন মিল মালিক গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কাঁচা তুলা আমদানির জন্য বিক্রেতা বা রফতানিকারকের সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করেন। এক পর্যায়ে মূল্য নিয়ে সমঝোতা হয় দুই পক্ষের মধ্যে। এরপর সংশ্লিষ্ট তুলা রফতানিকারক ওই আমদানিকারকের কাছে ঋণপত্র খোলা ব্যাংকের নাম জানতে চান। যদিও ব্যাংকের নাম জানার পর ওই ঋণপত্র গ্রহণে অসম্মতি জানান বিক্রেতা। আমদানিকারক এর কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সুনাম এখন আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ বলে জানান রফতানিকারক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই আমদানিকারক মিল মালিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তুলা আমদানি নিয়ে আমি এখন প্রচণ্ড চাপে আছি। দেশের দুটি বড় ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রেতার সঙ্গে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ দুই ব্যাংকের ঋণপত্র বিদেশী বিক্রেতারা নিচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা নেতিবাচক তথ্য জানতে পেরেছেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলো এ দুই ব্যাংকের ঋণপত্র নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।’

দেশের শ্রমঘন পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সুতা ও কাপড়। কাঁচা তুলা আমদানির মাধ্যমে সুতা ও কাপড় উৎপাদন করতে হয় বস্ত্র খাতের স্পিনিং মিলগুলোকে। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে তুলার মজুদ ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে বলে দাবি করেছিলেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকের সুনাম নিয়ে এমন বিরূপ অভিজ্ঞতা এখন তাদের উদ্বেগের মাত্রা বাড়াচ্ছে।

২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর বরাবর একটি চিঠি দিয়েছিল বিটিএমএ। সেখানে সংগঠনের সদস্য মিলগুলোর কাঁচামালের মজুদ দিয়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের উৎপাদন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর বিরূপ প্রভাব ও পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ সার্বিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাকের যে পরিমাণ রফতানি আদেশ রয়েছে, সে অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক ডলার সংকটের অজুহাতে টেক্সটাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তুলা, পিএসএফ, ডিএসএফ আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। এ প্রবণতা সুতা তৈরি ও রফতানিতে নিয়োজিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্বেগজনক বলে চিঠিতে জানিয়েছে বিটিএমএ।

ব্যাংকের সুনামজনিত কারণে ঋণপত্র-সংক্রান্ত বিড়ম্বনা এখন খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে শঙ্কার মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকের ঋণপত্র নিতে চাচ্ছে না, এ ধরনের সমস্যার বিষয়টি আমি শুনেছি। সংগঠনের কয়েকজন সদস্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আমাকে বলেছেন ওই সমস্যার কথা। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে।’

তুলার আমদানি সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন তুলা আমদানির দাম কমে নাই। পরিবহন খরচ কমে এসেছে। সুতার বিক্রি চলছে, দাম খুব খারাপ অবস্থা। ঋণপত্র নিয়ে সংকট মারাত্মক। মাসে দুই হাজার টন পণ্যের জন্য ঋণপত্র প্রয়োজন হয়। করা যাচ্ছে ৭০০ টনের মতো। ঋণপত্র করতে সমস্যায় পড়ছে ব্যাংকগুলো।’

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, রিজার্ভের সমস্যার কারণে এমনিতেই কাঁচামাল আমদানি নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে আমদানিকারকদের। এখন নতুন সমস্যা হিসেবে যদি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের ঋণপত্র গ্রহণ না করার ঘটনা ধারাবাহিক ঘটতে থাকে, তাহলে অবধারিতভাবেই পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।

বিটিএমএ বলছে, বস্ত্র শিল্প-কারখানা অব্যাহতভাবে চালু রাখতে হয়। কাঁচামাল আমদানি নিয়ে সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে মজুদ একেবারে ফুরিয়ে গেছে এমন কোনো তথ্য নেই। যেসব ঋণপত্র খোলা হয়েছে আগে, সেগুলোর মাধ্যমে আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে আগামী তিন মাস উৎপাদন চলবে। কিন্তু বর্তমানে ঋণপত্র খোলা নিয়ে অনেক ব্যাংক গড়িমসি করছে। কোনো কোনো ব্যাংক খুলছে না। যেগুলো খুলছে, স্বল্প পরিমাণের খুলছে। আবার কোনো কোনো ব্যাংক অনাগ্রহও প্রকাশ করছে। এখন নতুন করে বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকের ঋণপত্র গ্রহণ না করার প্রবণতা বাড়লে এক পর্যায়ে সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

দেশের ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরাও ঋণপত্র গ্রহণ না করার ঘটনাটি স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, এটা অশনিসংকেত শিল্প তথা দেশের অর্থনীতির জন্য। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো উপায় বের করার তাগিদও জানিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) লিমিটেডের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতার ঘটনা ঘটছে। বিদেশী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকের ঋণপত্র নিতে চাচ্ছে না। এর ব্যাপ্তি যদি বাড়ে, তাহলে ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বিদেশী ব্যাংক ও বিক্রেতারাও ধীরে এমন বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর নেতিবাচক প্রভাবের ব্যাপ্তিও বেড়ে যাবে। কোনো দেশের জন্যই এ ধরনের পরিস্থিতি সুখকর হওয়ার কারণ নেই। কোনোভাবেই দেশের বাণিজ্য সহায়ক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে না এ ধরনের ঘটনা। দেশের জন্য এবং শিল্পের জন্য এটা অশনিসংকেত। বিদেশী ব্যাংকগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। একটি দেশের ব্যাংকিং পরিস্থিতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে থাকলে সমস্যা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ধরনের সমস্যা হয়েছে মূলত ফরেন কারেন্সি সংকটের জন্য। তাত্ক্ষণিক সমাধান হিসেবে এ সংকট নিরসনে নজর দিতে হবে।’