রাজধানীর আবাসিক এলাকা মিরপুরের রূপনগরের বাসিন্দা আব্দুল্যাহ আল মামুন পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। দুই চুলার জন্য দিতে হতো ৯৭৫ টাকা। প্রি-পেইড মিটার লাগিয়ে নেয়ার পর প্রতি মাসে দুই চুলায় রান্না করলেও তার বিল আসে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মতো। প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করে গত চার মাসে দেড় হাজার টাকার বেশি সাশ্রয় হয়েছে তার। রাজধানীতে প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই এ সুবিধার কথা জানালেও মিটার বসানোর ক্ষেত্রে ধীরগতির অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিটার বসানো হলেও তাতে সংযোগ পেতে লাগছে ছয় থেকে আট মাস। ঠিক কী কারণে এত সময় লাগছে, তারও সদুত্তর পান না কোম্পানির লোকজনের কাছ থেকে। মিটার লাগানোর ধীরগতির কারণে পাইপলাইনের গ্যাসে বাড়তি বিল গুনতে হচ্ছে।
জরিপের তথ্য বলছে, সব চুলায় প্রি-পেইড সংযোগ দেয়া গেলে প্রতি সংযোগ থেকে ৩৩ ঘনমিটার করে গ্যাস সাশ্রয়ী হতো, যা নতুন সংযোগ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারত।
প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারীদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাইপলাইনের সংযোগ চেয়ে প্রি-পেইড সংযোগে ৪০০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। অর্থাৎ কেউ কেউ ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে দুই মাসের সমান গ্যাস ব্যবহার করতে পারছে। গত পাঁচ বছরে সরকার সব বিতরণ কোম্পানিকে গ্রাহকের দুয়ারে প্রি-পেইড মিটার বসানোর কথা বললেও তা বসাতে পারেনি। আবাসিক গ্যাস ব্যবহারকারীদের মোট গ্রাহকের মাত্র ৩ শতাংশ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ৪৩ লাখ গ্রাহকের আঙিনায় যদি প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা যেত, সেখানে সরকার বিপুল অংকের গ্যাস সাশ্রয় করতে পারত।
তিতাসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা গ্রাহকের আঙিনায় ২ লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করেছে। বেশির ভাগ ব্যবহারকারী বলছেন, তারা দুই চুলার বিপরীতে মিটারে ৪০০ টাকার গ্যাস সাশ্রয়ী হচ্ছেন। এভাবে ২ লাখ গ্রাহকের ৪০০ টাকা করে সাশ্রয়ী হলে মাসে ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে গ্রাহকের। অন্যদিকে গ্যাসের অপচয়ও কমছে। তবে আবাসিকের গ্রাহকরা যারা প্রি-পেইড মিটার পাননি, তারা এ সাশ্রয় পাচ্ছেন না। ফলে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারে কম-বেশি হলেও ৯৭৫ টাকা করে তাদের প্রতি মাসে বিল দিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, পাঁচটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় সারা দেশে গ্যাসের ৪৩ লাখ আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় ২৮ লাখ ৪৬ হাজারের মতো আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন। যার বেশির ভাগই ঢাকা ও আশপাশের এলাকার। এর মধ্যে মাত্র দুই লাখের মতো প্রি-পেইড মিটার সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে তিতাস। ৪৩ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে তিতাসের প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে এত ধীরগতিতে ভোগান্তি ও খরচ পোহাতে হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ফয়জার রহমান জানান, এরই মধ্যে আমরা দুই লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম শেষ করেছি। আরো ১ লাখ ২০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে আমরা নতুন করে মিটার স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারব।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রি-পেইড মিটার নিয়ে একটা মাস্টার প্ল্যান করেছি। সেখানে চার লাখ করে একটা প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে চলে গেছে। এভাবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে তিতাসের সব গ্রাহকের আঙিনায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম শেষ করা হবে।
প্রি-পেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি অনেক বিতরণ কোম্পানি। সিলেট অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে নিয়োজিত জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় গ্যাসের গ্রাহক রয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার।
যদিও কোম্পানিটি বলছে তাদের প্রকৃত গ্রাহক এক লাখ। কোম্পানিটি প্রি-পেইড মিটারের কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি এখনো।
বিষয়টি জানতে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপনা (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রি-পেইড মিটার বিষয়ে আমরা সব কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। বর্তমানে পেট্রোবাংলা থেকে মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র হস্তান্তর হয়েছে। এখনো অনুমোদন হয়নি। তবে আগামী সপ্তাহে অনুমোদন হয়ে গেলে ১ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে প্রথমে ৫০ হাজার গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার সংযোগ দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহককেই এর আওতায় আনা হবে।
এছাড়া পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস গ্রাহক কোম্পানির আওতায় ১ লাখ ২৮ হাজার এবং সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় ২ হাজার ৩৪৬টি আবাসিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। কোম্পানি দুটিরও প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। গত পাঁচ বছরে আবাসিক গ্রাহকের আঙিনায় প্রি-পেইড মিটার বসানোর কথা থাকলেও কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম এগিয়েছে কচ্ছপ গতিতে। মাত্র তিন লাখ আবাসিক গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে কোম্পানিগুলো।
গ্যাসের অপচয় রোধ করতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ন্যাচারাল গ্যাস ইফিশিয়েন্সি প্রকল্প (বিডি-পি৭৮) হাতে নেয় তিতাস। শুরুতেই প্রকল্পের মেয়াদ জানুয়ারি ২০১৫ থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ ধরা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৪৯৮ কোটি টাকা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিতাস মাত্র দুই লাখ আবাসিক গ্রাহকের দুয়ারে মিটার স্থাপন করতে পেরেছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আদেশে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের আদেশ জারি করে। সম্প্রতি বিইআরসি এ-সংক্রান্ত অগ্রগতি জানতে চেয়ে পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, বার বার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রি-পেইড মিটার বসাতে গড়িমসি করেছে। অনেক কোম্পানি প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে বিলম্বের সুযোগ নিয়ে এটাকে সিস্টেম লসের চেয়ে সিস্টেম গেইন দেখানোর সুযোগ পেয়েছে।
কোম্পানিগুলোর প্রি-পেইড মিটার লাগানোয় কালক্ষেপণের বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রি-পেইড মিটার না লাগানোটা একটা অপরাধ। এখানে কোম্পানিগুলো যে যুক্তি দেখাচ্ছে সেটি কালক্ষেপণ। তারা বিইআরসি আদেশ লঙ্ঘন, আইন অমান্য করেছে। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিতরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসির আইন অমান্য করে তারা বিগত বছরগুলোতে অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। মিটার ছাড়া গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোম্পানিগুলো দিনের পর দিন অর্থ আত্মসাৎ করছে। তারা গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছে।










