ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর আবারো শুরু হয়েছে চিকিৎসা কার্যক্রম। তবে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। চালু করা হয়েছে হাসপাতালের ওই ভবনের লিফটগুলোও। তবে যে লিফট থেকে আগুনের সূত্রপাত সেটি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের মোট পাঁচ সিঁড়ির মধ্যে চারটিই বন্ধ ছিল। গতকাল ভবনটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

হাসপাতালের বহির্বিভাগের এ ভবনে গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে আগুন লাগে। অভিযোগ রয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ লিফট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের পাঁচ সিঁড়ির মধ্যে চারটিই তালাবদ্ধ থাকায় দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন অগ্নিকাণ্ডে সরাসরি মৃত্যুর তথ্য অস্বীকার করেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে নতুন ভবনের লিফটের দ্বিতীয় তলায় (তৃতীয় তলা) থাকা একটি নষ্ট লিফটে প্রথম ধোঁয়া দেখা যায়। ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস অফিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার সানোয়ার হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে লিফটের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। এতে লিফটের সব যন্ত্রপাতি পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় ১ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনে।

হাসপাতালের স্টোর অফিসার ডা. ঝন্টু সরকার জানান, আটতলা নতুন ভবনের এ লিফটটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট ছিল। সেখানে রোগীর স্বজনদের ফেলা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও ময়লা-আবর্জনায় স্তূপ জমেছিল। ফলে নিমিষেই আগুন লিফটের ছাদ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রায় ২ ঘণ্টা হাসপাতালের নতুন ভবনের অন্যান্য চলমান লিফট বন্ধ থাকে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে বিপাকে পড়েন স্বজনরা।

এক হাজার ধারণক্ষমতার এ হাসপাতালে প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। ফলে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় বিছানা করে রোগীদের থাকতে হয়। জানা গেছে, নতুন ভবনের নিচতলা ও দোতলায় আউটডোর, তৃতীয় তলায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি এবং নিউরো সার্জারি, চতুর্থ তলায় হৃদরোগ, পঞ্চম তলায় কিডনি ডায়ালাইসিস ও আইসিইউ, ষষ্ঠ তলায় শিশু ও চর্ম-যৌন বিভাগ, সপ্তম তলায় নিউরো মেডিসিন, লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও রক্তরোগ এবং অষ্টম তলায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড ও ২০টি কেবিন রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় আইসিইউ ও হৃদরোগসহ অন্যান্য বিভাগের রোগীরা ভেতরেই ছিলেন। এ ঘটনায় ২ ঘণ্টা চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

হাসপাতালের নতুন ভবনে পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও এত দিন রোগীর স্বজনদের জন্য মাঝের একটি সিঁড়িই ব্যবহার হতো। চার কোনায় থাকা বাকি চারটি সিঁড়ি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে আগুন লাগার পর একটিমাত্র সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ভিড় ও হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয়। পঞ্চম তলায় থাকা রোগীর স্বজন আবু রায়হান জানান, তিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে তালাবদ্ধ দেখতে পান। পরে তালা ভেঙে তিনিসহ কয়েকজন বের হন। অষ্টম তলার রোগীরা ধোঁয়ার কারণে নিচে নামতে পারেননি বলে জানান রোগীর স্বজন আমেনা বেগম। রোগীর স্বজন ফরহাদ হোসেন অভিযোগ করেন, লিফটগুলো আগে থেকেই ব্যবহার অনুপযোগী ছিল, মাঝপথে আটকে যেত।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫), ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮), নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার হাজেরা বেগম (৫০) ও অজ্ঞাত এক শিশু। আহত হয়েছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলার জাহানারা বেগম (৫০)।

নিহত কুলসুমার ননদ নাজমা আক্তার জানান, কুলসুমার ছেলে স্বাধীন (১২) জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে ১১ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। আগুন লাগার পর ধোঁয়া দেখে ষষ্ঠ তলা থেকে ছেলে ও মেয়ে মীমকে নিয়ে নামার সময় চতুর্থ তলায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান কুলসুমা। পরে জরুরি বিভাগে তার মৃত্যু হয়। যক্ষ্মার চিকিৎসায় ভর্তি শাহজাহানের ছেলে পলাশ মোল্লা জানান, তার বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে নামার সময় পেছন থেকে ধাক্কা লেগে পড়ে যান। তার বাবা মারা গেছেন এবং মা ও খালা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর পদদলিত হয়ে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। গত সোমবার রাতে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয়জন মারা গেছেন। তবে মধ্যরাতে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘‌ছয়জনের তালিকার মধ্যে একজন জীবিত। বাকিদের মধ্যে দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

এদিকে হাসপাতালের একটি রেজিস্টারের পাতায় চারজনের নামের পাশে ‘ব্রট ডেড’ ও ঘটনার ধরনে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লেখা দেখা যায়। এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান জানান, ঘটনার পর কতজন হাসপাতালে এসেছেন তার হিসাব রাখতে নার্স এটি লিখেছেন, এর অর্থ আগুনে মৃত্যু নয়। তাছাড়া পদদলিত হয়ে মারা গেলে শরীরে যে আঘাত থাকার কথা, চিকিৎসকরা ওই চারজনের শরীরে তেমন কোনো চিহ্ন পাননি।

অগ্নিকাণ্ডের পর গতকাল সকালে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল পরিদর্শনের পর বন্ধ থাকা চারটি সিঁড়ি খুলে দেয়। সেখানে নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।