দেশের অধিকাংশ আমদানি বাণিজ্য হয় ব্যাংকিং চ্যানেলে। বিশ্ববাজার থেকে পণ্য বুকিং দিয়ে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয় ব্যবসায়ীদের। পণ্যের সমপরিমাণ অর্থ দেয়ার পরিবর্তে নামমাত্র টাকা জমা নিয়ে বন্ডেড পদ্ধতিতে পণ্য আমদানিতে বিনিয়োগ করে ব্যাংক। ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানির আগেই পণ্যের সমপরিমাণ কিংবা তারও বেশি অর্থ এসও (সরবরাহ আদেশ) বিক্রির মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেয়। তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করা এসব এসওই এখন মূল সমস্যায় পরিণত হয়েছে দেশের ভোজ্যতেল আমদানিকারকদের জন্য। দীর্ঘদিনের পুরনো এসব এসওর বিপরীতে ভোজ্যতেল সরবরাহ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন মিল মালিকরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমদানিকারকরা পণ্য আমদানির কয়েক মাস আগেই বাজার থেকে শত শত কোটি টাকা উত্তোলন করে নেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে এসও বিক্রি করে নেয়া এ টাকা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব। ভোজ্যতেল সংগ্রহের ১৫ দিনের সময়সীমা থাকলেও আমদানিকারকদের মৌন সম্মতি এবং ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্লিপ বাণিজ্যের কারণে এসও অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাজারে পড়ে থাকে। যার কারণে বছরের পর বছর দেশের বাজারে এসওগুলো হাতবদল হয়। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই বাজার স্থিতিশীল থাকায় দীর্ঘদিন আগে বিক্রি করা এসও দিয়ে কেউ ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে চাইলে সমস্যা হতো না। সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মাত্র এক সপ্তাহেই ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে পাইকারি বাজারে হাতবদল হতে থাকা দীর্ঘদিনের সব এসও এখন সময়ের সর্বোচ্চ লাভে অবস্থান করছে। এ কারণে সবাই ভোজ্যতেল উত্তোলন করতে চাইলেও সেই পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নেই। ফলে মিলগেটে ভোজ্যতেল সরবরাহ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
এ পাইকারি বাজারের এসও ব্যবসায়ী (ব্রোকার), ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সূত্রে জানা গিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগেও বাজারে আমদানিকারকরা মণপ্রতি সয়াবিনের এসও বিক্রি করেছে ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। পরবর্তী সময়ে পণ্য সংকটের আশঙ্কায় দেশের বাজারে কয়েক দিনের ব্যবধানে সয়াবিনের দাম উঠে যায় মণপ্রতি ৬ হাজার ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ২০০ টাকায়। এছাড়া গত কয়েক বছর পাইকারি বাজারে বর্তমান দামের অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করা এসও রয়েছে। এসব এসও যেসব ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্রোকারের রয়েছে, তারা দেড় গুণ থেকে দ্বিগুণ লাভে থাকায় দ্রুত মিলগেট থেকে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরনো এসওর বিপরীতে ভোজ্যতেল সরবরাহ দিতে এখন মিল মালিকরা অনীহা দেখাচ্ছেন।
বিষয়টিকে অর্থ লেনদেন ও অর্থ সংগ্রহের অবৈধ পন্থা বলে দাবি করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরাও। তাদের দাবি, এসও বিক্রিতে সময় উল্লেখ করা থাকলেও পণ্যের দাম লেখা থাকে না। দীর্ঘদিন পর মিলগেটে পণ্য উত্তোলন করতে গেলে মিলার প্রতিষ্ঠান সেটি দিয়ে দেয়। যার কারণে এসওর দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও সেটি বিক্রি হতেই থাকে। তাছাড়া বিক্রি হওয়া এসও দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে ভোজ্যতেল উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অবৈধ পন্থায় অর্থ উত্তোলনকারী আমদানিকারক এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যায় না। এতে পাইকারি বাজারে এসও এক ধরনের ‘বন্ড’-এর রূপ নেয়। পাইকারি বাজারে এখন এসওকে গ্যারান্টিযুক্ত জামানত কিংবা সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় নেন ব্যবসায়ীরা। অর্থের বিকল্প হিসেবেও খাতুনগঞ্জে এসওর ব্যবহার বা হাতবদল হচ্ছে। আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের এসও নিয়ে নমনীয় অবস্থানের কারণে দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, প্রায় ছয় মাস আগে পাইকারিতে পাম অয়েলের দাম ছিল মণপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে ওই সময়ের এসও নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী যদি তেল উত্তোলন করতে যান, তবে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বাজারমূল্যে কেনা পাম অয়েল সরবরাহে বিপুল পরিমাণ লোকসান হবে। যার কারণে দীর্ঘদিনের পুরনো এসও দিয়ে ভোজ্যতেল সরবরাহ করতে মিলমালিকরা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করছেন। ফলে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও এমন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
জানতে চাইলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নূরজাহান গ্রুপের পরিচালক মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক বাজার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। ২০০৮-২০১০ সালেও একই পরিস্থিতি ছিল। দেশের ঝুঁকি বিবেচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানই সক্ষমতার চেয়েও আমদানি বুকিং কমিয়ে দিয়েছে। যার কারণে সরবরাহ চেইনে কিছুটা সমস্যা থাকবেই। সরকার ভোজ্যতেলসহ অতি নিত্যপ্রয়োজনীয় চারটি পণ্য আমদানিতে জুন পর্যন্ত ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এক্ষেত্রে পণ্য আমদানির আগে এসও বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সমস্যা দায়ী থাকলেও একমাত্র কারণ নয় বলেই মনে করেন তিনি।
আমদানিকারকদের সূত্র বলছে, আসন্ন রমজানের আগে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। তাছাড়া পণ্যটির দাম ১০ দিন আগেও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে এখন পড়তির দিকে। মিলগেটে ভোজ্যতেল সংগ্রহের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। কিন্তু সক্ষমতার অতিরিক্ত সরবরাহ দেয়া সম্ভব নয়। এজন্যই আগের তুলনায় মিলগেটে উত্তোলনযোগ্য এসওধারী ট্রাকের সংখ্যা বেড়েছে। সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করায় নতুন করে খালাস হওয়া ভোজ্যতেলের সরবরাহ শুরু হলে এসব সমস্যা কেটে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারদের সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকারি মনিটরিং কার্যক্রম বৃদ্ধি, ভ্যাট প্রত্যাহার, টিসিবির সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে পণ্যটির দেশীয় পাইকারি বাজার এখন নিম্নমুখী। কিন্তু দাম কমলেও সরবরাহ সমস্যার কারণে ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছে না। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিলে সংগ্রহকারী ট্রাককে দুই থেকে সর্বোচ্চ ছয়দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিটি ট্রাককে একদিন অপেক্ষা করতে ব্যবসায়ীদের ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এ টাকা উত্তোলন হওয়া পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতার ক্রয় করা ভোজ্যতেলের ওপর বর্তাবে। মিলগেটে সরবরাহ দ্রুত করতে না পারলে সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করেও ভোজ্যতেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমাতে পারবে না বলে মনে করছেন তারা।










