পার্কিং নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরোধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ব্যাহত হচ্ছে রোগী ও মরদেহ পরিবহন। অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পরিবহনসেবা পাচ্ছেন না রোগী ও স্বজনরা। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন স্বজনরা। অন্যদিকে, মরদেহ বাড়িতে নিতে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে পিকআপ ভ্যান, রিকশা, ভ্যান কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার সাহায্য নিতে হচ্ছে অনেককে।

গতকাল মঙ্গলবার শুরু হওয়া এ ধর্মঘট আজ বুধবারও অব্যাহত ছিল। গতকাল সকাল থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, কলেজ গেট ও নতুন ভবনসহ আশপাশের এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও অনেক চালক রোগী পরিবহন করেননি। এতে চার-পাঁচ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাননি অনেকে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগী এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে পড়তে হয়েছে দুর্ভোগে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে মরদেহ বাড়িতে নেয়ার জন্য স্বজনরা দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছেন। অন্যদিকে, গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্যও চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন স্বজনরা। কিন্তু পরিবহনসেবা না পেয়ে অনেকেই বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করেন।

ডেমরা থেকে আসা মো. হৃদয় বলেন, তিনদিন আগে আমার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম। বুধবার সকাল সাতটার দিকে মা মারা যান। এরপর থেকে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চেষ্টা করছি। এখনো কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।

একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়েন রেজাউল নামে আরেক রোগীর স্বজন। তিনি জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তার বোনকে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মাওয়া থেকে ঢাকায় আসার পথে বাসের সঙ্গে একটি ট্রাকের সংঘর্ষ হলে তার বোন গুরুতর আহত হন। পরে তাকে জরুরি ভিত্তিতে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা প্রয়োজন হলেও অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছিল না।

রেজাউল বলেন, আমরা ৯৯৯-এ কল দিয়েছি এবং সরাসরি কথা বলেছি। তারা বলছে, গাড়ি চলবে না, আমরা যাব না। আমি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছি, কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। আমার বোনকে জরুরি ভিত্তিতে পঙ্গু হাসপাতালে নিতে হবে।

ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হলেও তাদের পরিবহন করা হয়নি। পরে শাহবাগ থানাকে বিষয়টি জানিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এরপর বাইরের যেকোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করে রোগী নিতে পারবে—এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে রোগী ও স্বজনদের বড় ধরনের ভোগান্তি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স চালক, মালিক সমিতি কিংবা অ্যাপসভিত্তিক সেবার বিপক্ষে নয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া যৌক্তিক রাখা এবং অ্যাপ, চালক ও সিরিয়ালসহ পুরো ব্যবস্থাপনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে শাহবাগ থানার সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে সমাধান না হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনায় বসবে।

সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ডা. মোস্তাক আহমেদ জানান, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ এবং ঢাকার বাইরে রোগী পরিবহন করা হয় না। ঢাকার মধ্যে রোগী পরিবহনের জন্যও সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা কম। ফলে সীমিত পরিসরে এ সেবা দেয়া হচ্ছে। বুধবারের মধ্যে এ বিষয়ে একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তিতে না ফেলতে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে, ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।