বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ডলুছড়ি মৌজার ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর তিনটি পাড়ার প্রায় ৪০০ একর জুম ভূমি নিয়ে একটি রাবার কোম্পানির বিরোধ সাড়ে তিন মাসেও নিষ্পত্তি হয়নি। গত ২৪ এপ্রিল ইজারা নেয়া হয়েছে—এমন দাবিতে ডলুছড়ি মৌজার ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০০ একর জুম ভূমির ফসল ও গাছপালা পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

এ ঘটনার সাড়ে তিন মাস পর ১৬ আগস্ট বান্দরবান জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিমিয় সভার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। এতে টাঙানো ব্যানারে লেখা হয় লামা উপজেলার ৩০৩ নং ডলুছড়ি মৌজার লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ম্রো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের পাড়াবাসীর মধ্যে জমির দখল নিয়ে অসন্তোষ ও দ্বন্দ্ব নিরসনে মতবিনিময় সভা হয়েছে। এ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।

জানা গেছে, সভায় ভুক্তভোগী লাংকমপাড়া, রেংয়ানপাড়া ও জয়চন্দ্রপাড়ার ২৬ নারী-পুরুষ এবং লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৩টার দিকে সভা শেষ হয়েছে।

সভা চলাকালীন দুপুর ১টার পর ৯ নারী-পুরুষ সভাস্থল থেকে বের হয়ে আসেন। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষের সামনে কথা হলে তারা জানান, আমাদের মূল বক্তা জয়চন্দ্র কারবারিকে বক্তব্য শুরু করার পর পরই থামিয়ে দেয়া হয়েছে। তিন পাড়াবাসীর মধ্যে তিনিই সবচেয়ে ভালো বাংলা বলতে পারেন। তাকে বলতে না দেয়ায় আমাদের সমস্যার কথা সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারিনি। পরে তিন পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারকে পাঁচ একর করে জুম ভূমি, তিন পাড়ার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য দুই একর ও শ্মশানের জন্য দুই একর ভূমি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আমরা এ প্রস্তাব মানি না।

পাড়াবাসী জানান, ১ হাজার ৬০০ একর লিজের কথা বলে এ পর্যন্ত তিন হাজার একরের বেশি জমি দখল করে বাগান করেছে লামা রাবার কোম্পানি। সভায় আমাদের মূল দাবি ছিল, আগে তাদের বাগানের মাপ নেয়া হোক। কিন্তু আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।

তারা বলেন, ২০১৬ সাল থেকে ডলুছড়ি মৌজার লাংকমপাড়া, রেংয়ানপাড়া ও জয়চন্দ্র পাড়ার প্রায় চারশ একর জুম ভূমিকে লামা রাবার কোম্পানির লিজের জমি দাবি করে আসছে। ওই জমি জবর দখলের উদ্দেশ্যে কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কামাল উদ্দিন পাড়াবাসীকে হুমকি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছেন। সর্বশেষ গত ২৪ এপ্রিল ১৫-২০ জন লোক দিয়ে গ্রুপটি তিন পাড়াবাসীর প্রথাগত জুম ভূমির প্রায় চারশ একর ভূমি ফসল পুড়িয়ে দেয়। এতে নানা প্রজাতির অগণিত বণ্যপ্রাণীরও মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার পর তিন পাড়ার মানুষ ভয়াবহ খাদ্য সংকটে পড়ে। এসব বিষয় সভায় ঠিকমতো স্থান পায়নি।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জুম ভূমি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনার পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন পৃথকভাবে তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত কমিটি পৃথকভাবে তদন্ত প্রতিবেদনও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে।

এর মধ্যে জেলা পরিষদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিজের শর্তানুযায়ী লিজ পাওয়ার ১০ বছরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট বাগান সৃজনে ব্যর্থ হলে কিংবা লিজ চুক্তির যে কোনো শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিজ বাতিল হয়ে যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিন পাড়ার জুম ভূমিকে লিজের অংশ বলে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের দাবি অযৌক্তিক।

সভা শেষে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশৈসিং সাংবাদিকদের বলেন, উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছি। পাড়াবাসীদের বক্তব্য অস্পষ্ট। পাড়াবাসীকে চিন্তাভাবনা করার সময় দিয়েছি। এজন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিবেচনা করব। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজী, পুলিশ সুপার জেরিন আখতার প্রমুখ।