দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের ছয়টি ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় নিঃস্ব হয়ে গেছে তিন শতাধিক কৃষক পরিবার। ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ৩০০ একর জমির ফসল পুড়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে বাগানের পর বাগানের গাছের আম। ভুক্তভোগী তিন শতাধিক কৃষক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ইউএনও।
স্থানীয়রা জানান, চলতি মে মাসের ১৩ ও ১৫ তারিখ ভোরে হামিদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পলাশবাড়ী ও বাঁশপুকুর মৌজার এআরবি ব্রিকস, একে ব্রিকস, সোহাগী ব্রিকস, অর্ণব ব্রিকস, একতা ব্রিকস ও জহুরা ব্রিকস বিষাক্ত ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। এতে দুই মৌজার ২০০ একর জমির ধান ও ১০০ একর জমির ৫০টি আমবাগান, বাঁশবাগান, লিচুবাগান, কলা, নারিকেল, পেয়ারা, জলপাই, বাদামসহ ৩০ ধরনের ফসলের মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হামিদপুর একটি ইউনিয়নেই রয়েছে ১৯টি ইটভাটা। যার বেশির ভাগই অবৈধ। দক্ষিণ পলাশবাড়ী ও বাঁশপুকুর মৌজার ছয়টি ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসের ফলে ওই এলাকার ধানক্ষেত পুড়ে গেছে এবং বাড়ির চারপাশের আম-কাঁঠাল ও অন্যান্য গাছের পাতা কুঁকড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া ফলগুলো ঝরে পড়েছে। ৫০টি বাগানের ফলন্ত আমের নিচের অংশ পচে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। বাগানের আমগুলো বর্তমানে বিক্রির অনুপযোগী। ওই এলাকার বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়ায় পুড়ে যাওয়ায় ফসল ঘরে তোলার মতো অবস্থায় নেই কোনো কৃষকের।
ধুলাউদাল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আজিজুর রহমান, মোজহারুল আলম, আবিদা খাতুন, আমিনুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ১৩ ও ১৫ মে ভোরে ছয়টি ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেয়। এরপর থেকে আস্তে আস্তে এ এলাকার সব ধরনের ফসল ও সবজির বাগান পুড়ে গেছে। বিষাক্ত গ্যাসের ফলে আমাদের এ এলাকার ধান, আম, লিচু, কাঁঠাল, বাঁশের ঝাড়, কলা, সবজি, আমড়া, জলপাই, সুপারি, বাদাম, পেয়ারা, লেবুসহ ৩০ ধরনের বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত পুড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্তরা আরো বলেন, আমরা ইটভাটায় যোগাযোগ করেছি, কিন্তু তারা আমাদের কথায় কোনো ধরনের কর্ণপাত করছে না। বাধ্য হয়ে আমরা ইউএনও বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছি। গত বছরও আমাদের এ এলাকার ফসলের কিছুটা ক্ষতি হয়েছিল। তবে এ বছর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমরা। আগামীতে এ ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়তে হয়, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই।
স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম আলী, রিয়াজুল মন্ডল, শাহনাজ বেগমসহ অন্যরা জানান, পুরনো পদ্ধতির (ফিস) ভাটা ব্যবহার করছেন ভাটা মালিকরা। এ ভাটার গ্যাস দিয়ে আমাদের আমের বাগানের আম, ধানসহ ৩০ ধরনের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। তারা বলেন, ভাটার মালিকরা অভিযোগ তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমরা এর প্রতিকার চাই।
এ ব্যাপারে হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন আগে ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসের ফলে এ এলাকার কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। তারা আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদের ইটভাটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেছি। আমাদের এ এলাকার অনেক কৃষকই বর্গাচাষী। তারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। এখন তাদের বেঁচে থাকার উপায় পর্যন্ত নেই।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা থেকে অতিরিক্ত কার্বন ও সালফার নির্গমনের ফলে ফসলের এ ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ কার্বন ও সালফার, গ্যাস অথবা ছাই আকারে ফসলের ক্ষতি করে থাকে। হামিদপুর ইউনিয়নে কৃষক ক্ষতির পরিমাণ প্রশাসন আমাদের কাছে লিখিত আকারে প্রতিবেদন চাইলে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে জানাতে পারব।
এ ব্যাপারে একে ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমার ইটভাটা বন্ধ থাকলেও আমার ভাটা থেকে গ্যাস ছাড়া হয়নি। এআরবি ব্রিকসের মালিক মো. মান্নান বলেন, আমার ইটভাটা কিছুদিন বন্ধ থাকলেও এখন চালু আছে। আমার ইটভাটা থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের গ্যাস ছাড়া হয়নি। অথচ এলাকার লোকজন আমাকে দোষ দিচ্ছে।
পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিদ কায়সার রিয়াদ বলেন, হামিদপুর ইউনিয়নের ছয়টি ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসের ফলে বহু কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। রোববার তিন শতাধিক কৃষকের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি আমি হাতে পেয়েছি। অভিযুক্ত ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।










