দেশের লজিস্টিকস খাতে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্রেইট ব্যবসা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এ খাতে প্রকৃত বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ খুবই সীমিত। তাই বিদেশী বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেয়া জরুরি।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) এ গোলটেবিলের আয়োজন করে। এতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং লজিস্টিকস খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে লজিস্টিকস খাতের প্রতিনিধিরা ছয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, লজিস্টিকস খাতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত লাভের বিষয়টি বিবেচনা করে বিনিয়োগ করে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ তৈরি হলে তারা অনেক সময় ব্যবসা থেকে সরে যায়। অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সব পরিস্থিতিতেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে হয়। তাই এ খাতে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ কতটা প্রয়োজন, সেটিও নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে নীতি সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তারা আরো বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকেরা গোলটেবিলে উত্থাপিত সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আরো সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে লজিস্টিকস খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালার ৬০-৪০ মালিকানা কাঠামোই বর্তমানে পুরো লজিস্টিকস খাতে দেশীয় মালিকানার সর্বোচ্চ মান। এটি শিথিল হলে অন্য উপখাতগুলোও একই ধরনের ছাড় দাবি করবে।

সাকিব আনোয়ার বলেন, ২০১৫ সালের সংশোধনীতে নতুন লাইসেন্সের ক্ষেত্রে শতভাগ বিদেশী মালিকানা নিষিদ্ধ করা হয় এবং যৌথ উদ্যোগে বিদেশী অংশীদারিত্ব ৪৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশে আনা হয়। তখন যুক্তি ছিল, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি স্বল্প সম্পদনির্ভর সেবাখাত, যেখানে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল খুব সীমিত।

তিনি আরো বলেন, শাখা কার্যালয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর দুই মাসের মধ্যে ন্যূনতম ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দেশে আনতে হয়, যা প্রকৃত বিনিয়োগ নয়, বরং অফিস পরিচালনার ব্যয়। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনেরও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দেশে আনুমানিক ৮৭৮টি লাইসেন্সধারী ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৩০টিতে সম্পূর্ণ বা আংশিক বিদেশী মালিকানা রয়েছে। ২০১৫ সালের সংশোধনীর পরও এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে।

তিনি জানান, শতভাগ বিদেশী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের বৈধতা নিয়ে করা রিট হাইকোর্টে বিচারাধীন। আপিল বিভাগ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে। রুল নিষ্পত্তির আগে বিধিমালা সংশোধন করা হলে ৭ বছরের বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

গোলটেবিলে ছয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে লজিস্টিকসের বিভিন্ন উপখাতে দেশীয় মালিকানার ন্যূনতম কাঠামো বজায় রাখা, লাইসেন্স প্রদানে অভিন্ন নীতি অনুসরণ, বিদেশি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রকৃত মূলধন বিনিয়োগের শর্ত নির্ধারণ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে যাওয়ার প্রভাব মূল্যায়ন এবং প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে বিধান আরো শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্রেইট ব্যবসা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ প্রত্যাশিত বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আনে না। অথচ নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ন্যূনতম বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করছে। যেহেতু বিদেশী বিনিয়োগ খুব কম আসে, তাই দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি প্রয়োজন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে দেশের নিজস্ব লজিস্টিকস শিল্প দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এ টি এম আজিজুল হক ডেভিড বলেন, উচ্চ সুদের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সুদের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ না এনে শুধু সেবা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নীতি প্রণয়নে দেশপ্রেম ও সততা থাকা জরুরি। অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। অথচ খাতসংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করা উচিত।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বিদেশীদের অংশগ্রহণের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে দেশের ফ্রেইট খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাস্তবতা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। সব খাতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজনীয় নয়। পরিকল্পনাহীনভাবে বিদেশী অংশগ্রহণ বাড়লে দেশীয় শিল্পের ওপর তাদের প্রভাবও বাড়বে।

তিনি বলেন, বিশ্ব এখন পুরোপুরি মুক্তবাজারের পথ থেকে সরে এসে নিজস্ব শিল্প ও উদ্যোক্তা গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক দেশ এ জন্য ঝুঁকি নিচ্ছে। বাংলাদেশকেও সেই পথে এগোতে হবে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

গোলটেবিলে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা, সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, সাংবাদিক হাসান মামুনসহ আরো অনেকে।