গত বছরের ফেব্রুয়ারির কথা। কুড়িগ্রামে একটি প্যারামেডিক ও নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় নথি চাওয়া হলে তা দেখাতে ব্যর্থ হন কেন্দ্রটির পরিচালক। একই সঙ্গে উঠে আসে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতির বিষয়টিও। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। একই সঙ্গে কেন্দ্রের তথাকথিত পরিচালকের ১ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড ঘোষণা করেন আদালত।
কুড়িগ্রামের মতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আনাচে-কানাচে এমন অনেক বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে সনদের আশায় ভর্তি হয়ে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। এমনকি কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই টাকার বিনিময়ে সনদ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। তথ্যানুন্ধানে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে এমন বেশকিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিতও হওয়া গিয়েছে। ভুয়া এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নীতিনির্ধারকরাও।
দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিকে বেগবান করতে এখন মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে সরকারি-বেসরকারি খাত। এর ধারাবাহিকতায় গত এক দশকে অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মান নিশ্চিতে খাতসংশ্লিষ্টদের নজরদারির ঘাটতিতে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে ৪৩ শতাংশ হারে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে ১৩ হাজার ১৬৩, এর মধ্যে ৮৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের।
একের পর এক গজিয়ে ওঠা এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মান নিয়ে সংশয় এবং চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল নিশ্চিত না হওয়ার বিড়ম্বনা মোকাবেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক তত্পর হয়ে উঠেছে সরকার। এরই মধ্যে আইনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি এখন ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা ২০২০’ প্রণয়নেরও কাজ চলছে। নীতিমালার একটি খসড়াও প্রস্তুত হয়েছে, যা বর্তমানে মতামত গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। খসড়ায় দেশের বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মানসম্মততা নিশ্চিতে নজরদারির তাগিদ দেয়া হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে অধিকাংশেরই নজরদারি এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ মান উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) দুলাল কৃষ্ণ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, এ ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। কিন্তু আমরা মান নিশ্চিত করব শুধু কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের। এনএসডিএ নতুন প্রতিষ্ঠান। এর শক্ত ভিত সৃষ্টি করতে পারলে সব প্রতিষ্ঠানই আমাদের আওতায় আসতে বাধ্য হবে। আমরা যে সনদ দেব, তা হবে জাতীয় মানদণ্ডের ভিত্তিতে। সে লক্ষ্যেই নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
নীতিমালার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এজন্য ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৮’ এবং ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিধিমালা ২০২০’ প্রণয়ন করা হচ্ছে।
খসড়ায় এ নীতিমালার প্রথম উদ্দেশ্য হিসেবে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব বণ্টন সম্পর্কে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে দক্ষতার চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর কথা। তৃতীয় উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার কথা।
এনএসডিএর এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১১ সালে দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা করেছিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সে নীতি অনুযায়ীই চলেছে এতদিন। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি কারখানার ভেতরেও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মানুষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যখন কারখানায় যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ বলছে একে দিয়ে কাজ হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় স্কিল গ্যাপ বা দক্ষতার ঘাটতি। এর ফলে তরুণ বেকার জনগোষ্ঠীর শ্রমের সদ্ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এনএসডিএর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন দেশের শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরাও। তারা বলছেন, দেশের শিল্প খাতের উৎপাদন ক্ষেত্রগুলোয় এখন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। নিত্যনতুন পদ্ধতিসহ স্থাপন করা হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প খাত পরিচালনায় প্রকৃত দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে প্রশিক্ষিত হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হলেও কাজে যোগ দেয়ার পর তাদের অদক্ষতার প্রকাশ ঘটছে। আবার যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সে ধরনের দক্ষ কর্মীও পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণেই দেশের শ্রমঘন খাতগুলোয় বিদেশী কর্মীরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপট বদলাতে বড় ভূমিকা রাখে প্রশিক্ষণ। কিন্তু সেখানেও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সরকারের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের আগ্রাসী পরিকল্পনা ছাড়া এ পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীই আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এদেরকে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের জন্য উপযুক্ত করতে হবে। এ নিয়ে নানা উদ্যোগ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলোয় সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। যখন চাকরিপ্রত্যাশীদের ইন্টারভিউ নেই, তখন তাদের দক্ষতার ঘাটতি প্রকাশ পেতে শুরু করলে আমাদের হতাশ হতে হয়। অনেক সময় কাজে নেয়ার পর অদক্ষতার প্রকাশে বিড়ম্বনার শিকারও হতে হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন হলে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ও খুলতে হবে।
এনএসডিএর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ জনসম্পদ থাকলেও তাদের কর্মদক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা ভারত ও শ্রীলংকা থেকে প্রচুর লোক এনে বাংলাদেশে কাজে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। প্রবাসে কর্মরত কর্মীরা দেশে বিপুল পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আবার এ রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশী কর্মীদের পারিশ্রমিক বাবদ। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষ গঠন হয়েছে। এ কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশিক্ষণ দেবে না, কিন্তু প্রশিক্ষণের বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনার মান দাঁড় করাবে। এর ধারাবাহিকতায় শিল্পের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণের সিলেবাস ও কারিকুলাম ঠিক করে দেয়া হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রশিক্ষণ দেবে। কিন্তু শেষে পরীক্ষা নেবে এনএসডিএ।
এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আরো একটি নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এরই মধ্যে জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিমালা-২০২০ শীর্ষক নীতিমালাটিরও খসড়া তৈরি হয়েছে। নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে এখনই সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে জনমিতিক মুনাফা অর্জনের। কিন্তু কর্মক্ষম এ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো বেকার ও অদক্ষ রয়ে গিয়েছে। দেশেও এখন যুবকদের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশে।
নীতিমালার খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছয় কোটির বেশি। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থান নীতি ও কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে বেকারত্ব নিরসন করা সম্ভব হবে।










