নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার। রফতানির শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের প্রতিটিই এখন মহামারীতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। রেমিট্যান্সও নিম্নমুখী। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘায়িত হওয়া থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট পর্যন্ত সবদিক বিবেচনায়ই বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো ভঙ্গুরতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও। সার্বিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সাম্প্রতিক এক নোটে মত প্রকাশ করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)।

ডব্লিউটিওর ‘দ্য কভিড-১৯ প্যানডেমিক অ্যান্ড ট্রেড-রিলেটেড ডেভেলপমেন্টস ইন এলডিসিজ’ শীর্ষক নোটে বলা হয়, উৎপাদনমুখী এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর পোশাক রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পতন ঘটতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে যেসব দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে ছিল, তাদের সে সম্ভাবনায়ও প্রভাব ফেলতে পারে চলমান মহামারী।

সংস্থাটি বলছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) ক্ষেত্রে রফতানি আয় সাধারণত প্রধান পাঁচ রফতানি গন্তব্যে কেন্দ্রীভূত। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের শীর্ষ বাজার জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ফ্রান্স কভিড-১৯-এর কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মোট রফতানির ১৫ দশমিক ১ শতাংশ আসে জার্মানি থেকে। ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ফ্রান্স থেকে আসে যথাক্রমে ৮ দশমিক ১ শতাংশ, ৭ ও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

নোটে বাংলাদেশের রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর বরাত দিয়ে জানানো হয়, চলতি বছরের এপ্রিলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে ৮৩ শতাংশ। এ সময় বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার কয়েক বিলিয়ন ডলারের রফতানি ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে। আবার রফতানি গন্তব্যগুলোয় খুচরা বিক্রেতারাও এরই মধ্যে দেউলিয়াত্ব থেকে সুরক্ষা নিতে শুরু করেছে, যা দেশগুলোর রফতানি চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলো সম্পর্কে নোটে আরো বলা হয়, এসব দেশ এখন রফতানি আয়ে বড় ধরনের পতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হতে শুরু করা ছাড়াও রেমিট্যান্স ও মোট জাতীয় আয়ও কমে যেতে পারে দেশগুলোর। উত্তরণ প্রক্রিয়ায় সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে এসব দেশের স্কোর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে সম্পদ নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে। দীর্ঘায়িত মন্দাও এ উত্তরণের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২১-এ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য মূল্যায়িত হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বাংলাদেশ নিজেকে পিছিয়ে নেবে কিনা, তা অনেকটাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করছে। 

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো দেশ যদি অনুরোধ করে তখন সে বিষয়ে বিবেচনা করে দেখা হতে পারে। যেমন ২০১৮ সালে নেপাল বলেছিল, আমাদের ভূমিকম্প হয়েছে, আমাদের উত্তরণ মূল্যায়নের বিবেচনায় নেবেন না। ২০২১-এ যদি কোনো দেশ সেটা করে, তাহলে সেটা নিশ্চয়ই দেখা হবে। আমাদের এখন ২০২০ সালটা কেমন যায়, সেটি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা একটা বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। কারণ বাংলাদেশের ৫০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমরা ওই ধরনের সিদ্ধান্তে যাব কিনা, সেটা ভাববার বিষয়। তখন বাস্তব অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে। বাস্তবতার নিরিখেই ২০২১ সালে বাংলাদেশের উত্তরণ নিয়ে সুপারিশের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ২০২১-এ সুপারিশ করা মানেই ২০২৪-এ এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। কভিড-১৯ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমাদের চিন্তা করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে বাজার প্রবেশাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জড়িত।

তবে পিছিয়ে যাওয়ারও কিছু ঝামেলা রয়েছে জানিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখনই আমরা মধ্যম উন্নতের মর্যাদায় উঠে যাব তখনই সরকারি ও ব্যক্তি অর্থায়নের দরজাটা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। বিদেশী বিনিয়োগটা আমাদের খুব দরকার। এলডিসি হিসেবে গরিবের জন্য যে সহায়তা সেটা আমরা পাই, কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশ হলে আমাদের স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থাও অনেক বাড়বে। সেজন্যই এলডিসি উত্তরণের সুযোগ না নেয়াটা বোকামি হবে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) সিইও আলী আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমি এখনো আশাবাদী। সংশ্লিষ্ট সূচকগুলোয় আমাদের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখা গেলেই আমাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ সম্ভব। গতবার আমরা তিনটি সূচকে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হয়তো আগামীতে দুটিতে উত্তীর্ণ হব। তার পরও আমাদের পক্ষে উত্তরণ সম্ভব। এর পরের মূল্যায়ন হবে ২০২৪-এ। এখনো আমাদের নিয়ে যে ধরনের পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে, সেগুলোয় আমরা ক্রমেই ওপরে উঠছি। আমি তাই বিশ্বাস করি, ২০২১-এর মূল্যায়নে আমরা উত্তীর্ণ হব এবং ২০২৪-এ আমাদের উত্তরণ হবে।

তিনি আরো বলেন, ২০২১ সালে সরকারের সুপারিশ ছাড়াও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই আমাদের মর্যাদার মূল্যায়ন করা হবে, কারণ ২০১৮ সালে করা হয়েছে। ২০২১-এর মূল্যায়নে অংশগ্রহণ না করতে হলে বাংলাদেশকে সেটা লিখিতভাবে বলতে হবে। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া সরকারের উচিত হবে না। কারণ ২০২১-এ যদি আমরা মূল্যায়নের অংশ না হই, তাহলে আমরা অনেক পিছিয়ে যাব।