জনগণের কাছে সরকারি ৫১টি সেবা পৌঁছে দেয়ার দায় সোনালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির গ্রাহক সংখ্যাও প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বৃহৎ এ ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের সংখ্যা এক লাখেরও কম। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও নেই ব্যাংকটির। নগদ অর্থ উত্তোলন-জমা থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের সেবা পেতে ব্যাংকটির শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোই গ্রাহকদের একমাত্র ভরসা।

এ পরিস্থিতি শুধু সোনালী ব্যাংকের নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আটটি ব্যাংকের লেনদেনের প্রধান মাধ্যমই শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো। এ ব্যাংকগুলোর ৯৮ শতাংশ লেনদেনই হয় গ্রাহক স্বশরীরে শাখায় উপস্থিতির মাধ্যমে। দেশের অনেক বেসরকারি ব্যাংকের পরিস্থিতিও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মতোই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত জানুয়ারিতে দেশের ব্যাংকগুলোর আন্তঃব্যাংক লেনদেন ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। চেক ক্লিয়ারিং, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি), ডেবিট, ক্রেডিট কার্ডসহ অন্যান্য মাধ্যমে এ লেনদেন করেছেন গ্রাহক। এর মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ লেনদেন ছিল ডিজিটাল বা কার্ডভিত্তিক। টাকার অংকে এর পরিমাণ ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ৯৩ শতাংশের জন্যই গ্রাহকদের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে লেনদেনের ৯৮ শতাংশই শাখানির্ভর।

যেকোনো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ টাকা স্থানান্তর নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসব লেনদেনের কোনো তথ্য থাকে না। যেমন পূবালী ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় উপস্থিত হয়ে কোনো ব্যক্তি যদি একই শাখার অন্য কোনো গ্রাহক বা ব্যাংকটির দেশের যেকোনো শাখার গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে নগদ টাকা জমা দেন, সে অর্থ পূবালী ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। গ্রাহক চেকের মাধ্যমে নিজ ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুললেও সেটি ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। সে হিসেবে দেশের ব্যাংকিং খাতে মাসে মোট কত টাকা লেনদেন হয়, তার হিসাব বের করা কঠিন। এ পরিসংখ্যান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেও নেই। তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ লেনদেনের এ হিসাব যুক্ত করলে দেশের ব্যাংকিং লেনদেনের ৯৯ শতাংশই শাখানির্ভর।

নভেল করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে ১৫০টিরও বেশি দেশের সেবা খাত। লকডাউনে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ। বাংলাদেশের পরিস্থিতিও জবুথবু। এখন পর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাকেই করোনা প্রতিরোধের একমাত্র প্রতিষেধক ধরা হচ্ছে। মহামারী ঠেকাতে সরকার যখন নামাজের জামাতেও পাঁচজনের বেশি উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছে, তখন ব্যাংকিং সেবার জন্য শাখাগুলোয় চলছে মহাসমাবেশ।

গ্রাহকদের সেবা দিতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ ব্যাংকাররা দাবি তুলছেন ব্যাংক বন্ধ রাখার। পরিবারসহ নিজেকে নিরাপদ রাখার কথাই বলছেন তারা। যদিও দেশের ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের ধরন বলছে, ব্যাংক বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি করতে ব্যাংকগুলোই ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংকারদের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আওতা বাড়ানোয় গ্রাহকের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও দায়ী বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এ প্রধান নির্বাহীর মতে, ডেবিট কার্ড দিতে চাইলেও অনেক গ্রাহকই নিতে চাননি। বার্ষিক ফি দিতে হবে, এ ভয় থেকে অনেকেই ডেবিট কার্ড ফেরতও দিয়েছেন। কার্ড দেয়ার কারণে অনেক গ্রাহক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগও করেছেন। তবে এটি ঠিক, সব ব্যাংক সক্রিয়ভাবে গ্রাহকের কাছে কার্ড পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়নি। ডেবিট কার্ডধারী গ্রাহকের সংখ্যা যদি আরো বেশি হতো, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে শাখায় উপস্থিতির পরিমাণ কমত।

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে ব্যাংকিং সেবা দিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিও এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের পোহাতে হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে গ্রাহকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকের শাখাগুলোতে শত শত গ্রাহক ভিড় করছেন। প্রায় সব শাখায়ই ঠাসাঠাসি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের টাকা তুলতে হচ্ছে। ভিড় কিছুটা কম হলেও টাকা তুলতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) গ্রাহকদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকেই তা অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখাগুলোকে নভেল করোনাভাইরাস বিস্তার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। পুরনো ব্যাংকিংয়ের ধারণাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মী ও গ্রাহকদের ঝুঁকিতে ফেলছে বলে মনে করছেন তারা। একই পরিসংখ্যান দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর মোট ডেবিট কার্ডধারী গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮৬ লাখ ১১ হাজার ৬৮১। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি ব্যাংকের কার্ডধারী গ্রাহকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ লাখ ৮৮ হাজার ২২৯। এ হিসেবে দেশের মোট ডেবিট কার্ডধারী গ্রাহকদের মাত্র ২ দশমিক ৬২ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ডেবিট কার্ডের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে। জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডধারী গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৮। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সবক’টি ব্যাংকের গ্রাহক মাত্র ৮ হাজার ৪৩৩। প্রিপেইড কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মতো আধুনিক ব্যাংকিং সেবাগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে শুরু হয়নি। জানুয়ারিতে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডসহ অন্যান্য ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে মোট লেনদেন হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। এ লেনদেনের মাত্র ২ দশমিক ১৫ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে হয়েছে।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস শিওরক্যাশের হিসাবসহ রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে ৩০ লাখ হলো রূপালী ব্যাংকের সরাসরি গ্রাহক। বাকি বকে কোটি হিসাব হলো উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর মায়েদের খোলা শিওরক্যাশের। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সেবা দিতে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল্্ মাসুদ বলেন, সরকার মসজিদে নামাজের জামাতে পাঁচজনের বেশি উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছে, অথচ ব্যাংকগুলোয় শত শত গ্রাহক ভিড় করছেন। বর্তমানে ব্যাংকের শাখাগুলোয় কাঁচাবাজারের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিছু গ্রাহক ইচ্ছা করেই অল্প টাকা তোলার জন্য আসছেন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থেই ব্যাংকাররা ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাংকে ভিড় কমানোর জন্য আমরা বিকাশ, রকেট ও শিওরক্যাশের সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছি। রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকরা এসব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করেই ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলতে পারবেন।