এডিস
মশা নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা
সাধারণ মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণে কোনো
পদক্ষেপ নেই বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) কর্তৃপক্ষের। সারা বছর মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ থাকলেও তা দেখার কেউ
নেই বলে দাবি নগরবাসীর। বিসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মশক
নিধনে ১ কোটি ৯৮
লাখ ৬০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এ তথ্য গ্রহণযোগ্য
নয় বলে দাবি নগরবাসীর। কাগজে-কলমে যে খরচ দেখানো
হয়েছে তা মশক নিয়ন্ত্রণে
তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না নাগরিকরা। তাদের
মতে, মশক নিয়ন্ত্রণে নেয়া কোনো পদক্ষেপই নজরে আসেনি। সচেতন নগরবাসীর দাবি, এখনই মশা নির্মূলে ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষার শুরুতেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ বরিশাল নগরীর বাসিন্দারা। অবস্থা এমন যে শুধু রাতে নয়, দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে থাকতে হচ্ছে নগরবাসীকে। তবে এ অবস্থায়ও মশক নিধনে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো কার্যক্রম না থাকায় দিন দিন মশা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মশা নিধনে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছে নগরবাসী।
বরিশাল নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের জিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা হারুন হাওলাদার বলেন, দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে ও মশারি টানিয়ে ঘরে থাকতে হয়। বাসায় কিছু সময় এক স্থানে বসে থাকলে হাত ও পা থেকে মশা ঝেড়ে ফেলতে হয়। এ অবস্থায়ও কখনো সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মীকে মশা মারার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি গত পাঁচ বছরে।’
একই ওয়ার্ডের রূপাতলী হাউজিং এলাকার ২৫ নম্বর রোডের বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, ‘ছয়তলায় একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও কন্যা নিয়ে থাকি। মশার উৎপাত এত বেশি যে সন্ধ্যার পর সন্তানকে মশারির মধ্যে রাখতে হয়। মশার জ্বালায় বাসায় কোথাও একটানা বসে থাকা যায় না। মশার কামড়ে স্বাভাবিক কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ মশা মারতে সিটি করপোরেশনের লোকজনের দেখা মেলে না।
তিনি আরো বলেন, ‘নগরীর অন্য এলাকার তুলনায় ২৪ নম্বর ওয়ার্ডটি এটি নিম্নাঞ্চল। সারা বছরই এ ওয়ার্ডে পানি জমে থাকে। এর মধ্যে নতুন নতুন বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। এছাড়া রূপাতলী হাউজিং এলাকার পাশেই বাস টার্মিনাল। যে কারণে টায়ার-টিউবসহ অন্য যন্ত্রপাতি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। টার্মিনালের রাস্তার দুই পাশের ড্রেন ও নালায় অসংখ্য প্লাস্টিকের কাপ, পানির বোতল, ককশিটের বাক্স, ডাবের খোসা, ঠোঙা জমে আছে। এখানে প্রচুর মশা জন্মায়। কিন্তু এ এলাকায় সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটায় না।’
নগরীর ১২ নম্বর ওয়ার্ডের খ্রিস্টানপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মাইকেল জন বলেন, ‘সাগরদীর পুরনো খালটি হলো মশার কারখানা। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হলে মশা যেভাবে ঘিরে ধরে মনে হয় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দিনেও মশা কামড়ায়। ২৪ ঘণ্টা কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয় বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। বাচ্চাদের মশারির মধ্যেই রাখতে হয়।’
নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অক্সফোর্ড মিশন রোডের বাসিন্দা টিপু শিকদার বলেন, ‘আগে দেখতাম সন্ধ্যা হলে মশার উৎপাত শুরু হয়। এখন দিন-রাত সমানতালে মশার যন্ত্রণা। তবে সন্ধ্যার পর তা চরমে পৌঁছে। সন্ধ্যার পর কয়েল বা স্প্রে ছাড়া ঘরে থাকা যায় না। এর পরও মশক নিধনের কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। বৃষ্টি হলে এডিস মশা বাড়বে। আবার গরমে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলেও মশা বাড়বে। তাতে ডেঙ্গুজ্বর ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত জুন-সেপ্টেম্বর এ সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি। এ সময়কে ডেঙ্গুর মৌসুম বলা হয়। তবে সিটি করপোরেশন নগরীর সদর রোডসহ ভিআইপি কিছু এলাকায় যে ওষুধ ছিটাচ্ছে, তা মশা মারতে কতটা কার্যকর পরীক্ষা করে দেখা দরকার।’
নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাওলানা রেজাউল করিম বলেন, ‘নগরীর সবখানেই মশার উৎপাত। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম চললেও মশা কমছে না। মশা নির্মূলে আগাম ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।’
নগর ভবন সূত্র জানায়, বরিশাল সিটির ৫৮ বর্গকিলোমিটারে প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। ৩০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত এ নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন মাত্র ১০০ কর্মচারী। আধুনিক সরঞ্জাম বলতে রয়েছে ১১টি ফগার মেশিন। আর রয়েছে ৮০টির মতো হস্তচালিত স্প্রে মেশিন। তবে যারা এসব পরিচালনা করছেন, তাদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে তারা জানেন না কোথায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে। কোন মশার জন্য কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। আর কীটনাশক প্রয়োগের মাত্রার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা কতটুকু।
বরিশাল সিটির পরিচ্ছন্নতা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘মশক নিধনে আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে কাজ করছি। প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি টিম মশার লার্ভা শনাক্তে কাজ করে। লার্ভা শনাক্ত হলে সেখানে হ্যান্ড স্প্রে ব্যবহার করে লার্ভা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া বিকালে ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধনে স্প্রে করা হয়। তবে এডিস মশার লার্ভা শনাক্তে বরিশালে কোনো ল্যাব নেই। যে কারণে যেখানে যে ধরনের লার্ভাই পাওয়া যাক সেগুলো ধ্বংস করা হয়। দিনে পাঁচটি টিম ফগার মেশিন দিয়ে ও একটি টিম লার্ভা ধ্বংস করতে হ্যান্ড স্প্রে নিয়ে অভিযান চালায়। ’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খন্দকার মনজুরুল ইমাম বলেন, ‘দুই বছর বরিশালে ডেঙ্গুর তেমন প্রকোপ ছিল না। এজন্য জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকেও কোনো প্রতিনিধি আসেনি। দুই বছরে যারা এসেছেন তারা বরিশালে এডিসের লার্ভা পাননি। এখন পর্যন্ত যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন তারা সবাই ট্রাভেল পেশেন্ট। আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকায়। ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন। সেখান থেকে অন্যরা সংক্রমিত হয়েছেন। তবে এ বছর বরিশালেই শনাক্ত হচ্ছে। এখনো আইইডিসিআর থেকে কোনো প্রতিনিধি বরিশালে আসেননি।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মশক নিধন কর্মসূচি চলমান। নগরীর খাল, ড্রেন, জলাশয়, ডোবা, নালা, নর্দমা পরিষ্কার করা হচ্ছে। খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মশার উপদ্রব আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’










