দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্যতেল বাজারজাত হয়। এর মাত্র ৩৫ শতাংশ তেল বোতলের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়। বাকি ৬৫ শতাংশই কেমিক্যাল, মবিল বা অন্যান্য পণ্যের ব্যবহূত অস্বাস্থ্যকর-নোংরা ড্রামে বাজারজাত হচ্ছে। এছাড়া ড্রামে বাজারজাত করা এসব ভোজ্যতেলে পরিমিত মাত্রায় ভিটামিন-এ থাকে না। সব ভেজাল তেল খেয়ে দিন দিন নতুন নতুন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ছয় মাসের মধ্যে শতভাগ ভোজ্যতেল ফুডগ্রেডেড বোতল বা পাত্রে বাজারজাত করার জন্য রিফাইনারিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানার সভাপতিত্বে সম্প্রতি ফর্টিফায়েড অব এডিবল অয়েল ইন বাংলাদেশ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ভোজ্যতেলের ড্রাম ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থাপিত সমীক্ষায় দেশের ভোজ্যতেল বাজারজাত ব্যবস্থার চিত্র উঠে আসে। এর ভিত্তিতেই সভায় ফুডগ্রেডেড বোতল বা পাত্রে ভোজ্যতেল বাজারজাত করতে রিফাইনারিগুলোকে সময় বেঁধে দেয়া হয়। সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা, বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক ড. মো. নজরুল আনোয়ার, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল রিফাইনারি ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পক্ষে পরিচালক শফিউল আতাহার ও বিভিন্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ভোজ্যতেল পরিবহনের ড্রামগুলো নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ভোজ্যতেলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ড্রাম না থাকায় কেমিক্যাল, লুব্রিক্যান্ট বা মবিল অথবা অন্যান্য পণ্যের ব্যবহূত ড্রামগুলোই তেল পরিবহনে পুনর্ব্যবহার করা হয়, যা প্যাকেজিং আইনের পরিপন্থী। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোজ্যতেল এসব অস্বাস্থ্যকর ড্রামে বাজারজাত করা হয়। বাকি ৩৫ শতাংশ বোতলের মাধ্যমে বাজারজাত হয়। বাজারজাত প্রক্রিয়ার কারণে অসংক্রামক অসুখে আক্রান্ত মানুষের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া বাজারজাত করার সময় রিফাইনারিগুলো ড্রামে কোনো লেবেল ব্যবহার করে না। ফলে অনেক সময় বিএসটিআই ড্রামের মালিক খুঁজে পায় না, তাই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারে না।
নিয়ম অনুযায়ী ভোজ্যতেলে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা গেছে, ড্রামে বাজারজাত করা এসব তেলের প্রায় অর্ধেকেই ভিটামিনটির অস্তিত্ব থাকে না। বিএসটিআই ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোতলজাত তেলের ৫২০টি ও ড্রামজাত তেলের ৩৯৩টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, বোতলজাত তেলের ৮৭ শতাংশে ভিটামিন-এ পাওয়া গেছে। তবে ড্রামে বাজারজাতকৃত তেলের ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশে ভিটামিন পাওয়া গেছে।
সভায় উল্লেখ করা হয়, এ সমস্যাগুলো সমাধানে ফর্টিফায়েড অব এডিবল অয়েল ইন বাংলাদেশ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ভোজ্যতেলে ড্রাম ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সারা দেশে তিনটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালাগুলোর প্রধান সুপারিশ ছিল ড্রামের তেল নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ায় ড্রামের মাধ্যমে ভোজ্যতেল বাজারজাত বন্ধ করে ড্রামের পরিবর্তে প্লাস্টিক বোতল, পলিপ্যাক ও প্লাস্টিক ফয়েলের বিভিন্ন আকৃতির ফুডগ্রেডেড পাউচপ্যাকের মাধ্যমে বাজারজাত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। এ সুপারিশের আলোকে রিফাইনারি ও সমিতিকে জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থ বিবেচনায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ড্রামে ভোজ্যতেল বাজারজাত বন্ধ করে ফুডগ্রেড প্যাকে ভিটামিন-এ মিশ্রিত ভোজ্যতেল বাজারজাত নিশ্চিত করতে বলা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সভায় আরো জানানো হয়, কর্মশালাগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী ড্রামে বিকল্প নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন রিফাইনারি ও সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে পাঁচটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাগুলোর একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত ছিল যে রিফাইনারিগুলো ও সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনগুলো ড্রামের বিকল্প বিষয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। কিন্তু এ বিষয়ে রিফাইনারিগুলো কোনো প্রস্তাব দেয়নি। পরবর্তী সময়ে চলতি বছর মার্চে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত কমিটি সুপারিশে বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ও ফুডগ্রেড পাত্রে লেবেল ও মালিকের নাম জানিয়ে সব রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানকে ভোজ্যতেল বাজারজাত করতে বলা হয়। একই সঙ্গে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিএসটিআইয়ের বিদ্যমান সব আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা।
পুষ্টিগত উন্নয়ন সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার, যা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এজন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ভেজালমুক্ত ভোজ্যতেল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে রিফাইনারিগুলোকে ছয় মাস অর্থাৎ ২০২২ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তাদের অস্বাস্থ্যকর ড্রামের পরিবর্তে ফুডগ্রেডেড ড্রাম, বোতল বা পাউচপ্যাকে শতভাগ ভোজ্যতেল বাজারজাত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ সময়ের এটি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। তবে আশা করছি নির্ধারিত সময়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব। সবাইকে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি। রিফাইনারিগুলো অনেক বেশি সময় চেয়েছিল। সেখান থেকে আমরা ছয় মাস সময় দিয়েছি। ছয় মাসে যে আমরা শতভাগ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব, সেটা ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা সময় বেঁধে দিয়ে অবস্থার উন্নয়নে চেষ্টা করছি। এছাড়া আমরা প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগে মনিটরিং বাড়াচ্ছি। আশা করছি আমরা উন্নয়ন ঘটাতে পারব।
সভায় উপস্থিত বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর গণমাধ্যমে জনসাধারণের সচেতনতা সৃষ্টি ও রিফাইনারিগুলোকে সতর্ক করে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। ভোজ্যতেল পরিবহন ও সংরক্ষণে ব্যবহূত ড্রামগুলোতে কোনো লেবেল না থাকায় এর উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তাই কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে মানবিক কারণে বিএসটিআই কিছুটা বিব্রত হয়। তাই লেবেলবিহীন ড্রামের ব্যবহার অবশ্যই পরিহার করতে হবে, এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। আগামীতে আইনের প্রয়োগে আরো কঠোরতা দেখানোর কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশ এডিবল অয়েল রিফাইনারি ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক শফিউল আতাহার বলেন, খোলাবাজারে বা ড্রামে তেল পরিবহনের ক্ষতিকর দিকগুলোর বিষয়ে রিফাইনারিগুলো অবগত আছে এবং এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কাজও করছে। কিন্তু কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এ কাজে কিছুটা গতি কমেছে। তারা প্রথমে সয়াবিনকে বোতল বা অন্যান্য ফুডগ্রেডেড পাত্রে বাজারজাতের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পাম অয়েলও ফুডগ্রেডেড পাত্রে বাজারজাত করা হবে।










