তিলোত্তমা ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোর একটি শাহবাগ। এখানেই এক সময় অবাধে চলত হরিণের পাল। এমন দুর্লভ দৃশ্য এখন যে কাউকেই হয়তো অবাক করবে। আর ১০০ বছর আগের এমন একটি ছবির সংগ্রহ রয়েছে ঢাকা নগর জাদুঘরে। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় এ দুর্লভ আলোকচিত্রের সংগ্রহটি ধূসর হয়ে গেছে। শুধু শাহবাগের এ ছবিই নয়, ঢাকার এমন ১০১টি দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে জাদুঘরটিতে। যার অধিকাংশই এখন নষ্ট হওয়ার পথে।
জানা যায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৮৭ সালের ২০ জুন জাদুঘরটির পথচলা শুরু; পুরান ঢাকার পাঁচ ভাই লেনের একটি বাড়িতে। ১৯৯৬ সালের ২০ জুলাই নগর ভবনে (বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবন) জাদুঘরটি স্থানান্তরিত হয়। নামকরণ করা হয় ঢাকা নগর জাদুঘর। তখনকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফের আগ্রহে নগর ভবনে এটি স্থানান্তরিত হয়। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করেন।
পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকার গোড়াপত্তন আজ থেকে ৪০০ বছর আগে। তবে ঢাকায় জনবসতির ইতিহাস আরো প্রাচীন। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া তথ্যমতে, সপ্তম শতাব্দীতে ঢাকায় জনবসতির শুরু। তবে ৪০০ বছর পরও প্রতিনিয়তই ঢাকা নিত্যনতুন রূপে বদলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ক্রমবিবর্তনের এ রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিজ চোখে দেখার একটি দারুণ সুযোগ ছিল ঢাকা নগর জাদুঘর। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সে সুযোগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা নগর জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ঢাকা নগরীর স্মৃতিসংক্রান্ত জানা-অজানা নানা বিষয়। ১০০ বছর আগের ঢাকার একটি মানচিত্র ছাড়াও প্রাক-মোগল আমল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত ঢাকার সীমানার ধারাবাহিক বৃদ্ধির নকশা আছে এখানে। রয়েছে ঢাকার ইতিহাস-সংবলিত ১০১টি দুর্লভ আলোকচিত্র। এছাড়া ঢাকার প্রথম ছাপাখানা ও নবাবি আমলের হুক্কা, উনিশ শতকে ঢাকার নবাবদের ব্যবহূত পানের বাটা, সে আমলের মুদ্রা, পানদানি, তামার বালতি, জগ, ড্রেসিং টেবিল, শাঁখা ও শাঁখা তৈরির করাত, বদনাসহ নানা উপকরণ। দুর্লভ আলোকচিত্রের মধ্যে আছে পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেন, রূপলাল হাউজ, হোসেনি দালানের আদি রূপ, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, সাতগম্বুজ মসজিদ, উনিশ শতকে নির্মিত বিভিন্ন বাড়ি, সেন্ট জেমস গির্জা (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে), পুরনো হাইকোর্ট ভবন, ১৯০৪ সালে দিলকুশার নবাববাড়ি, ডানা দীঘি ইত্যাদি।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ‘ঢাকা নিউজ’ মুদ্রণকাজে ব্যবহূত মুদ্রণযন্ত্রটিও রয়েছে এ জাদুঘরে। এ মুদ্রণযন্ত্র উনিশ শতকের (১৮৪৭-৪৮) মাঝামাঝি সময়ের। সেই সময় এ মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেছিলেন সুইজারল্যান্ডের স্যামুয়েল বোস্ট। পুরান ঢাকার একটি জীর্ণ বাড়ি থেকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা নগর জাদুঘরের ট্রাস্টি হাশেম শফি এ মুদ্রণযন্ত্র এখানে সংরক্ষণ করেছিলেন। এখানে রয়েছে মোগল ও ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন দলিল, ছবি, গ্রন্থসহ নানা জিনিস। ঢাকার ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালসহ নানা আন্দোলনের বেশকিছু দুর্লভ আলোকচিত্র ও পোস্টারও রয়েছে জাদুঘরটিতে।
তবে এসব দুর্লভ চিত্র ও উপকরণের বেশির ভাগই এখন নষ্টের পথে। অযত্ন-অবহেলায় দুর্লভ এসব সংগ্রহ নষ্ট হচ্ছে। রঙিন ছবিগুলো হয়ে গেছে ধূসর। খুবই কাছ থেকে না দেখলে ছবির বিষয়বস্তু বোঝার উপায় নেই। জাদুঘরটি পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। অন্য বিভাগের লোকজন দিয়েই চলছে। সে অর্থে এটির পেছনে সিটি করপোরেশনের আলাদা কোনো ব্যয় নেই।
কথা হয় জাদুঘরটির তত্ত্বাবধায়ক ভূপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছি। অনেক মেয়র জানতেনও না নগর ভবনে একটি সুন্দর জাদুঘর আছে। বর্তমান মেয়র এখন পর্যন্ত দুবার এসেছেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন।
জানা গেছে, কভিডকালীন বাদে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে দৈনিক চারজন দর্শনার্থী নগর জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৪৭ জন টিকিট কেটেছেন জাদুঘরটি পরিদর্শনের জন্য। এর মধ্যে কভিডের প্রায় দেড় বছরে দর্শনার্থী এসেছেন ১ হাজার ৭৭০ জন। এ সময়ে জাদুঘরটি পরিদর্শন বাবদ সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছে ১৫ হাজার ৪৯০ টাকা।
ব্যাপক আকারে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি জাদুঘরটি উন্মুক্ত জায়গায় নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন ঢাকা গবেষক ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মুনতাসীর মামুন ও হাশেম খানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাদুঘরটির জন্ম। পরবর্তী সময়ে নগর জাদুঘরটি মেয়র হানিফের আগ্রহে নগর ভবনে স্থানান্তরিত হয়। তবে এত বছরেও নগর জাদুঘরটি সমৃদ্ধ হতে না পারা আমাদের জন্য দুঃখজনক।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়র হানিফের পর আর কেউই জাদুঘরটির বিষয়ে আর আগ্রহ দেখাননি। ফলে এখন একটি মৃত সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে ঢাকা নগর জাদুঘরটি। এ বিষয়ে কথা হয় ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে। জাদুঘরটির উন্নয়নসহ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। আফসোসের সঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তিল তিল করে গড়ে তোলা সংগ্রহগুলো অযত্নে নষ্ট হতে দেখে কষ্ট হচ্ছে কিনা, শেষ এ প্রশ্নের উত্তরেও ছিল অভিমানের লেশ। গলাভারী সুরে বললেন, ‘এ ধরনের কষ্ট পেয়েই জীবন সমুদ্রের এতটা পথ পাড়ি দিয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহম্মেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন একটি অনুষ্ঠানে আছি। জাদুঘরটির ব্যাপারে বিস্তারিত না জেনে কিছু বলতে পারব না।’










