দুই বছর ধরে দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, শিপিং চার্জ বেড়ে যাওয়ার কারণে গত কয়েক মাসে আমদানিনির্ভর পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। দাম নিয়ন্ত্রণে ভোজ্যতেল আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয় সরকার। একই সঙ্গে দামও ঠিক করে দেয়া হয়। সরকারি তত্পরতায় দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে চলে এলেও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলে ফের বেড়েছে অতি নিত্যপণ্যটির দাম। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে দেশের ভোজ্যতেলের বাজার।
২০১১ সালে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ জারি করে সরকার। এতে আমদানিকারকদের দেশব্যাপী ডিলার নিয়োগের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রতিপালন না হওয়ায় অল্পদিনেই নতুন প্রবর্তিত এসও প্রথা ভেস্তে যায়। ফলে আগের ডিও পদ্ধতিতেই পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের লেনদেন শুরু হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে দেশে ভোজ্যতেলসহ অতি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় রাখতে গত ১৭ মার্চ থেকে সরকার ভোজ্যতেল আমদানি ও বিপণনে মোট ২০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে। এর আগের কয়েকদিন ধরেই শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। সে সময় সরকারিভাবে খোলা সয়াবিনের দাম পাইকারিতে লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা ও পাম অয়েলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। বোতলজাত সয়াবিনের দাম ধরা হয় ১৬৮ টাকা। সরকারি এ সিদ্ধান্তের ফলে সে সময় পাইকারি পর্যায়ে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৫ হাজার ৫০ ও সয়াবিনের পাইকারি দাম ৫ হাজার ৬০০ টাকায় নেমে যায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে ভোজ্যতেলের দামে অস্বাভাবিক পতনের কারণে পাইকারি পর্যায়ে ট্রেডিং ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে কম দামে এসও (সাপ্লাই অর্ডার) সংগ্রহ করে নেয়। দাম আরো কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ব্রোকার বা ডিও ব্যবসায়ীরা লোকসানে ভোজ্যতেলে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে ফের বাড়তে শুরু করেছে পণ্যটির দাম। মূলত সাধারণ ডিও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভোজ্যতেলের বিক্রয় আদেশ সংগ্রহের পর বাজারে চাহিদা বৃদ্ধিতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে সংকট তৈরি হলে দেশের ভোজ্যতেলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা গত ১৭ মার্চ জরুরি বৈঠক করেন। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল কেনা-বেচার আহ্বান জানান ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুব আলমসহ বাজারসংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বৈঠকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমে যাওয়ায় পণ্যটির দাম আরো বাড়লেও সমস্যা হবে না বলে মন্তব্য করেন ব্যবসায়ীরা। তবে আমদানিকারকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য না কিনতেও আহ্বান জানানো হয়েছিল। মূলত ওই বৈঠকের পরই পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করে।
সর্বশেষ গত রোববার পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় আগের দামে ফিরে গেছে। অর্থাৎ সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করার পরও পাইকারি বাজারগুলোয় ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, মিলগুলো নির্ধারিত দামে এসও সরবরাহ করার পরও পাইকারি বাজারে গিয়ে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দামের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রক্রিয়াটি চলমান, যার কারণে সরকারি একাধিক উদ্যোগেও খোলা ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এজন্য ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যকেই দায়ী করেছেন তারা।
সর্বশেষ গতকাল মণপ্রতি পাইকারিতে পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ টাকায়, সয়াবিন ৬ হাজার ৫০০ ও সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার টাকায়। যদিও এসও কিংবা স্লিপ পর্যায়ে এসব ভোজ্যতেলের মণপ্রতি দাম ১০০ টাকা হারে কম ছিল। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যবৃদ্ধির জন্য আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন। যদিও ব্রোকার ও আমদানিকারকরা মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কারসাজি রয়েছে বলে দাবি করছেন।
খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে শ খানেক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মাত্র ১০-১৫টি বড় ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেলের আমদানি-পরবর্তী বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে ভোজ্যতেলের দাম কমে গেলে আহাদ ট্রেডিং, আরএম এন্টারপ্রাইজ, এএম ট্রেডিং, মীর আহম্মদ সওদাগরসহ বেশ কয়েকটি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান কম দামে পণ্য কিনে নেয়। বাজার থেকে ব্রোকার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা স্লিপ কিংবা এসও কম দামে কিনে নেয়ার পর চাহিদা বাড়তে থাকলে দামও বাড়িয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এতেই গত দুই সপ্তাহে খাতুনগঞ্জের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) শফিউল আতহার তাসলিম বণিক বার্তাকে বলেন, পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে কি কমছে সেটি আমাদের দেখার বিষয় না। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেলের সরবরাহ আদেশ (এসও) বিক্রি করছি। এরপর পাইকারি বাজারে গিয়ে সেটি কোন দর নির্ধারিত হয় তা ব্যবসায়ীদের বিষয়। তবে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিলগেট থেকে ভোজ্যতেল সরবরাহ দিচ্ছি, যার কারণে বোতলজাত ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে কোনো সংকট নেই, দামও বাড়েনি। দেশব্যাপী ডিলারদের কাছে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ধরে রাখতে পারলে ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ভোজ্যতেল আমদানির আগেই কোম্পানিগুলো সেটি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করে দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজার, দেশীয় চাহিদাকে পুঁজি করে এসব এসও লেনদেন হয়। এসওগুলো ১৫ দিনের মধ্যে মিলগেটে নিয়ে পণ্য উত্তোলনের কথা থাকলেও কোনো পক্ষই সেটি মানছে না, যার কারণে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি ও অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত পাইকারি বাজারে এসও হাতবদল হয়ে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বোতলজাত ভোজ্যতেল সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে এলেও পাইকারি বাজারে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর এসও নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এসওতে মিল থেকে ভোজ্যতেল উত্তোলনের নির্দিষ্ট সময় মেনে না চলায় বাজার কারসাজির সুযোগ পায় ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো। আমরা এরই মধ্যে মিলগুলোয় নির্ধারিত সময়ের পর এসওর বিপরীতে ভোজ্যতেল সরবরাহ না দিতে নির্দেশনা দিয়েছি। আশা করছি, মিল মালিকদের সহযোগিতায় ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর দৌরাত্ম্য কমে আসবে।










