বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত এক যুগে সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে সংস্থাটির অবকাঠামো উন্নয়ন, অত্যাধুনিক ইঞ্জিন ও কোচ আমদানিসহ বিভিন্ন খাতে উদারহস্তে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু রেলের উদাসীনতা, অদূরদর্শিতার কারণে এ বিনিয়োগের অনেকাংশই কাজে আসেনি। পুরনো জীর্ণ সেতু, পুরনো ট্র্যাক, প্লাটফর্ম, প্লাটফর্ম শেডের কারণে দেড় বছর আগে আমদানি হওয়া ৩০টি মিটার গেজ ইঞ্জিনের যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না রেলওয়ে।
২০২১ সালের ৪ অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ৩০টি ইঞ্জিন রেলওয়ের পরিবহন ও মেকানিক্যাল বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সর্বশেষ ইঞ্জিনটি আসে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর। তবে নতুন ইঞ্জিনগুলোর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে রেলওয়ে। যাত্রী পরিবহন সবচেয়ে অগ্রাধিকারের জায়গা হলেও এক্ষেত্রে নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার হচ্ছে ১১টি। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে ১০টি। বাকি নয়টি ইঞ্জিন জরুরি প্রয়োজন, তাত্ক্ষণিক ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে ফেলে রাখা হয়েছে।
দেশের প্রধান ১০টি রেলরুটের মধ্যে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, ঢাকা-পঞ্চগড়, ঢাকা-রাজশাহী পর্যন্ত নতুন ইঞ্জিন ব্যবহার করা যাচ্ছে। বাকি ছয়টি রুট অর্থাৎ চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ, ঢাকা-নোয়াখালী, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ট্রেনগুলোতে নতুন আমদানি হওয়া এসব ইঞ্জিন ব্যবহার করতে পারছে না রেলওয়ে।
রেলের মেকানিক্যাল বিভাগ বলছে, আগে যে ইঞ্জিনগুলো ছিল সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারীগুলোর গড় ওজন প্রতি এক্সেলে ১১ দশমিক ৯৬ লোডের হিসাবে (প্রতিটি ইঞ্জিনে ৬ এক্সেল) ৭০-৭২ টন। বর্তমানে আমদানি হওয়া ও আমদানির প্রক্রিয়ায় থাকা ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন ১০০ টনেরও বেশি (প্রতি এক্সেলে ১৫-১৬ টন)। সর্বশেষ প্রযুক্তির ইঞ্জিন হওয়ায় এসব ইঞ্জিন এক্সেল লোডের হিসাব থেকেও ভারী হয়। সে কারণে আমদানি হওয়া নতুন ইঞ্জিনগুলো প্রায় শতবর্ষী পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না। সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু, ভৈরব পুরনো সেতু, কুশিয়ারা সেতু, ঘোড়াশাল (আপ) সেতু, শম্ভুগঞ্জ সেতু, ঘুমঘাট সেতু ও ছাতক-সিলেট রুটের ২৮ নং সেতু। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব সেতু দিয়ে বর্তমানে ১১ দশমিক ৯৬ টন এক্সেল লোডবিশিষ্ট লোকোমোটিভ/কোচ নিয়ন্ত্রিত গতিসীমায় চলাচল করে। কিন্তু নতুন ১৫-১৬ টন এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলো চালাতে গেলে এসব সেতু সংস্কার বা নতুন সেতু নির্মাণ করতে হবে।
ইঞ্জিন আমদানির পর লোড-সংক্রান্ত এ সংকট দেখা দেয়ায় সম্প্রতি এক্সেল লোড বাড়িয়ে পুরনো সেতুগুলো দিয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলো চালাতে বুয়েটের সহায়তা নিচ্ছে রেলওয়ে। এরই মধ্যে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বুয়েটের পরামর্শ মেনে সংস্কারকাজ শেষ হলেই এসব সেতু দিয়ে নতুন ইঞ্জিনগুলো চলাচল করতে পারবে। তবে এ পুরো প্রক্রিয়াটিই সময়সাপেক্ষ। আর সেটি না হওয়া পর্যন্ত ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার করাও সম্ভব হবে না।
রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের তথ্য বলছে, ৬ এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলো রেলের অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পুরনো সেতু দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। আবার দীর্ঘদিনের পুরনো রেলপথ, স্টেশন প্লাটফর্ম, স্টেশন শেডের কারণেও এসব ইঞ্জিন নির্দিষ্ট কিছু রুট ছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ইঞ্জিনগুলো পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর এবং পশ্চিমাঞ্চলের ঢাকা-পঞ্চগড়, ঢাকা-রাজশাহী রেলপথে চালানো হচ্ছে।
২০১৮ সালে ১০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ সরবরাহে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২৯৭ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয়ে এসব ইঞ্জিন কেনা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০টি ডিজেল ইলেকট্রিক রেল ইঞ্জিনও কিনেছে সরকার। এতে ব্যয় হয়েছে ৮৪১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। জি-টু-জি পদ্ধতিতে কেনা এসব ইঞ্জিন রেলের বহরে যুক্ত হয় ২০২১ সেপ্টেম্বর থেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩০টি নতুন ইঞ্জিন কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এগুলো মাত্র দুটি রুটে পরিচালনা এক ধরনের অপচয়। এসব ইঞ্জিন আমদানির আগেই রেলওয়ের উচিত ছিল সঠিক পরিকল্পনা করা। মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কিংবা আমদানির জন্য চুক্তি হওয়ার পর বিদ্যমান রেলপথ ও আনুষঙ্গিক সংকট দূর করতে ব্যবস্থা না নেয়ায় বিপুল ব্যয়ে আমদানি করা ইঞ্জিনগুলোর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ইঞ্জিন সংকটে চাহিদা থাকার পরও নতুন নতুন ট্রেন সংযোজন করতে পারছে না রেলওয়ে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়েতে ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। প্রতিদিন ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও ৯৫ থেকে ১০০টি ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হয় রেলওয়ের পরিবহন বিভাগকে। প্রায়ই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। অথচ নতুন ইঞ্জিন আমদানি করেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলো আগের লোকোমোটিভের তুলনায় বড় ও ভারী। যার কারণে পুরনো সেতু ও রেললাইনে চলাচল করা যাবে না। এ কারণে সীমিত কিছু পথে চালানো হচ্ছে। যেসব রেলপথে চালানো যাচ্ছে না সেগুলোর উন্নয়নে বেশকিছু কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করি শিগগিরই অন্য রুটগুলোতেও নতুন আমদানি হওয়া লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।
রেলওয়েসংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চল রেলের অন্যতম জনপ্রিয় রুট ঢাকা-সিলেট রেলপথ। পুরনো সেতু ও রেলপথের কারণে এখন পর্যন্ত এ রুটে নতুন ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না রেলওয়ে। বেশকিছু সমস্যা সমাধান করে কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা-নোয়াখালী রুটে নতুন ইঞ্জিনগুলোর ট্রায়াল রান শুরু করবে রেলওয়ে। বাকি রুটগুলোতে ভারী এসব লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করার জন্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করতে হবে রেলওয়েকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেতু। ফলে কোরিয়ান ৬ এক্সেল লোডের ইঞ্জিনগুলোর শতভাগ উপযোগিতা পেতে রেলওয়েকে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
এছাড়া ২০২১ সালে সরকারি রেল পরিদর্শক, ঢাকার জিআইবিআর পরিদর্শনে উঠে আসে নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনের প্লাটফর্ম শেডের উচ্চতা এবং কুলাউড়া স্টেশনের ১, ২ ও ৩ নং প্লাটফর্মের শেডের উচ্চতা-সংক্রান্ত জটিলতার কথা। পরিদর্শনে দেখা যায়, নতুন মিটার গেজ লোকোমোটিভগুলোর উচ্চতা থেকে এসব শেডের উচ্চতা কম। ফলে এই প্লাটফর্ম শেডগুলো নতুন করে নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ট্র্যাকের মান খারাপ থাকায় পূর্বাঞ্চলে চলাচলরত সেকশনগুলোতে এক্সেল লোড কোনো অবস্থায় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে চলাচল করতে নির্দেশনা দেয়া হয় জিআইবিআর ইন্সপেকশনে।
জানা গিয়েছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মোট লোকোমোটিভের সংখ্যা ছিল ১৭০। দুই-তৃতীয়াংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়মিতভাবে দৈনিক ৯০-৯৫টি ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হতো রেলওয়েকে। ২০২১ সালে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানি হলে পর্যায়ক্রমে বেশকিছু ইঞ্জিন স্ক্র্যাপ করে ফেলা হয়। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের মোট ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৫৯। প্রতিদিন পরিবহন বিভাগ থেকে গড়ে ১১৬টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও পাওয়া গিয়েছে ১০০টি। ফলে দৈনিক ১২ থেকে ১৬টি ইঞ্জিনের ঘাটতি নিয়ে সারা দেশে ট্রেন পরিচালনা করতে হয় রেলওয়েকে। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনে নতুন আমদানি হওয়া ৩০ ইঞ্জিনের মাত্র ১১টি ব্যবহার করা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ের দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে আমদানির পরও ব্যবহারহীন অবস্থায় রয়েছে নতুন একাধিক ইঞ্জিন। রেলওয়ে মূলত যাত্রীসেবা সংশ্লিষ্ট দপ্তর। নিয়ম অনুযায়ী পণ্যবাহী ট্রেনগুলোতে পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করে যাত্রীবাহী ট্রেনে নতুন ইঞ্জিনের ব্যবহার হয়। কিন্তু বর্তমানে সব রুটে চালানো সম্ভব না হওয়ায় যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রায় সমপরিমাণ নতুন ইঞ্জিন পণ্যবাহী ট্রেনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানি করা হলেও এর প্রকৃত সুফল পাচ্ছে না রেলওয়ে।
তবে সার্বিক বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মঞ্জুর আলম চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।










