যশোর সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ রোধে খামারের দুই হাজার ৭৮টি মুরগি মেরে পুঁতে ফেলা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১২ মার্চ খামারে মারা যাওয়া মুরগির নমুনা ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় রিপোর্ট পজিটিভ হলে ১৩ মার্চ খামারের ছয়টি শেডের দুই সহস্রাধিক মুরগি মেরে পুঁতে ফেলা হয়। একই সঙ্গে শেড খালি করে পরিষ্কার ও জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৩ মার্চ ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট পাওয়ার পর খামারের ছয়টি শেডের দুই হাজার ৭৮টি মুরগি মেরে পুঁতে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে খামারে কোনো মুরগি নেই। শেডগুলো খালি করে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। খামারিদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি খামারের বাইরে ময়লা ফেলার জায়গা রয়েছে। এছাড়া খামারে পাখির আনাগোনা থাকে। এসব মাধ্যমে বার্ড ফ্লু ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে নিশ্চিত নই, কোন মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। একই সঙ্গে কোনো খামারে মুরগি মারা গেলে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
২০০৭ সালের মার্চে বাংলাদেশে প্রথম বার্ড ফ্লু দেখা দেয়। সে বছর ১০ লাখেরও বেশি মুরগি মেরা ফেলা হয়। ২০০৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশে মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ ধরা পড়ে। দেশে মাংসের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি জোগান দেয় পোলট্রি খাত।
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে ৯৫ হাজার ৫২৩টি খামার রয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও ডলার সংকটে বেড়ে গেছে প্রাণিজ খাদ্যের দাম। কভিডের পর থেকে খরচ সামলাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে ৬২ হাজার ৬৫৬টি খামার। এবার বার্ড ফ্লু যেন দেশের খামারিদের আরেকটি মহামারীতে না ফেলে, এজন্য ফ্লু বিস্তার রোধে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পোলট্রি খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাকে মার্চের শুরুতে বার্ড ফ্লু শনাক্তের বিষয়টি জানানো হয়েছে। ফ্লুর বিস্তার যাতে বাড়তে না পারে, সেজন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ফ্লু বিস্তার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যশোরের খামারটি পরিদর্শন করেছেন। ফ্লু কীভাবে বাংলাদেশে এসেছে, তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ফ্লুর পরীক্ষাবিষয়ক টেকনিক্যাল বিষয়গুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলতে পারবেন।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘১২ মার্চ যশোরের সরকারি খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। আমরা যে নমুনা পেয়েছি তা পরীক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠাব। তবে মৃদু আকারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি পোলট্রি খামার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। একই সঙ্গে খামারিদেরও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছি। যাতে তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, ভ্যাকসিন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সীমান্ত এলাকায় আমাদের কার্যালয়গুলোকে সতর্ক রাখতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষায়িত ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশে খামারে ২০০৭ সালে প্রথম এবং ২০১৮ সালে সর্বশেষ বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। এবার আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এবারের পরিস্থিতি অন্যবারের মতো নয়। বার্ড ফ্লু নিয়ে যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি বা প্রচারণা না ছড়ায়, সেদিকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। খামারি বা ক্রেতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ হাঁস-মুরগি বা ডিম খাওয়া বন্ধ করবেন না।’
প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন ও আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে যশোরে গড়ে তোলা হয় সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। ১৯৫৯ সালে শহরের শংকরপুর এলাকায় ২৭ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত খামারটিতে ৪০ লাখের বেশি বাচ্চা উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। সেখানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র দেড় লাখ মুরগির বাচ্চা। নানা সংকটে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখতে পারেনি খুলনা বিভাগের একমাত্র খামারটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারে প্রতি বছর সরকারের ব্যয় হয় ১ কোটি টাকা। আয় হয় ৭০ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে আসছে খামারটি।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, যশোরে ১ হাজার ৩৬৮টি ব্রয়লার ও ১০৮টি লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে। এর মধ্যে যশোরের আফিল লেয়ার ফার্ম খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড়। এখানে প্রতিদিন ছয় লাখ ডিম ও দুই লাখ বাচ্চা উৎপাদন হয়ে থাকে।
আফিল গ্রুপের পরিচালক মাহাবুব আলম লাবলু জানিয়েছেন, ভাইরাসে গত দুইদিনে তাদের খামারে ২০ হাজার মুরগি মারা গেছে। প্রাণিসম্পদ থেকে তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।যশোর সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার ছবি: ফাইল/নিজস্ব আলোকচিত্রী










