নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবেলায় দেশজুড়ে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চললেও দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, বিদেশফেরতদের হাতে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার অমোচনীয় সিল লাগানো এবং পরবর্তী সময়ে তাদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা, এমনকি কভিড-১৯ আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির মরদেহ পরিবহন থেকে সত্কারের কাজ করতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া এসব করতে গিয়ে নিজের অজান্তে সংক্রমিত হয়ে পড়েছেন অনেক পুলিশ সদস্য।

এরই মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বেশ কয়েকজন সদস্যের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টি উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। সেখানে তিনি বলেছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২১০টি দেশে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারী রূপ ধারণ করেছে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে ডিএমপির বিভিন্ন স্তরের সদস্যরা দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে ডিএমপির কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দেহে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

ডিএমপির বেশ কয়েকটি থানা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ মাস্ক পরে থাকলেও সেভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার বা গ্লাভস পরতে দেখা যায়নি। অবশ্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষের সামনেই হ্যান্ডশেক, কোলাকুলিকে নিরুৎসাহিত করে টানানো আছে ফেস্টুন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তাদের গ্লাভস ও মাস্ক পরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তবে এসব ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যই। তারা বলছেন, ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের কাছ থেকে পুলিশ সদস্যদের দূরত্ব খুব কম থাকে।

এদিকে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ডিএমপির সদস্যদের উদ্দেশে ২৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। কোনো অফিসার বা ফোর্সের সর্দি, কাশি, জ্বর, গলাব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ডিউটিতে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সব পুলিশ সদস্যের মাস্ক, 

গ্লাভস, রেইন কোট বা পিপিই, চশমা ও জুতা পরার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়েও তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

শুধু ডিএমপিতেই নয়, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশেও (সিএমপি)। রোববার চট্টগ্রামে বিআইটিআইডির নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ ফলাফলে আক্রান্ত ছয়জনের মধ্যে একজন পুলিশ সদস্য। এ ঘটনার পর নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনের একটি ব্যারাক লকডাউন করা হয়েছে। ওই ব্যারাকে অবস্থান করা ২০০ পুলিশ সদস্যসহ মোট ২২৫ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। আক্রান্ত কনস্টেবল নগরীর দামপাড়ায় মহানগর পুলিশ লাইনের একটি ব্যারাকে বসবাসরত কনস্টেবল। তিনি সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের উত্তর জোনে কর্মরত। তার বয়স ৫৫ বছর।

সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি-মিডিয়া) আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। ছয়দিন আগে তিনি জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে দামপাড়া পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি হন। নমুনা পরীক্ষায় সংক্রমণ শনাক্তের পর তাকে নগরীর আন্দরকিল্লায় অবস্থিত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্ত কনস্টেবল যে ব্যারাকে বসবাস করতেন, সেখানে আরো ২০০ পুলিশ সদস্য থাকতেন। তাদেরও কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়া ডাক্তার-নার্সসহ ১৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং একই কক্ষে চিকিৎসাধীন থাকা আরো ১২ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। ব্যারাকটি লকডাউন করা হয়েছে।

ডিএমপি ও সিএমপির পাশাপাশি জেলা পুলিশের অনেক সদস্য নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার এক পুলিশ সদস্যের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। ওই পুলিশ সদস্য ৬ এপ্রিল জ্বর নিয়ে ছুটিতে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার বীরবাশাইল গ্রামে নিজ বাড়িতে যান। পরে তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে তার করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। বর্তমানে ওই পুলিশ সদস্য মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরে মুকসুদপুর থানার ৩৫ পুলিশ সদস্যের মধ্যে ওসিসহ সাতজনকে থানা কম্পাউন্ডের একটি ভবনে হোম কোয়ারেন্টিনে এবং বাকি ২৮ জনকে মুকসুদপুর সরকারি কলেজের একটি ভবনে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়ে কথা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এ সংকটময় পরিস্থিতিতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। এরই মধ্যে তাদের জন্য সুরক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরো কিছু সুরক্ষা উপকরণ দেয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাদের সুরক্ষার বিষয়ে আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি।