সিলেট বিভাগের অন্যতম প্রধান নদী সুরমা। দীর্ঘদিন ধরে নদীটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দখল, দূষণ আর অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগেছে। এবার মাছের বাজার সম্প্রসারণের নামে নদীতীর দখল করে প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দখল ছাড়াও আড়তের আবর্জনায় নষ্ট হচ্ছে নদীর পানি। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করলেও পুনরায় দখল হচ্ছে নদীতীর। সম্প্রতি নগরীর পশ্চিম কাজিরবাজারে নদী দখল করে মাছের বাজার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কাউন্সিলর সিকন্দর আলীর ছোট ভাই মাছের আড়তের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম তীর দখল করেছেন। এর আগে ২০১৯ সালে একইভাবে সুরমার তীর দখল করে ১০-১২টি দোকান করেন জাহাঙ্গীর। গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসন সেগুলো উচ্ছেদ করে। তারও আগে জাহাঙ্গীর নদীতীরে গণশৌচাগারের নামে বিশ্রামাগার তৈরি করেছিলেন। সেটিও গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অভিযোগ প্রসঙ্গে কাজিরবাজার মৎস্য বাজারের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আড়তের মাছ প্রায় সময় চুরি হয়ে যায়। চুরি ঠেকাতে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে আমরা দেয়াল ভেঙে নদীর জমি ছেড়ে দেব।’

পশ্চিম কাজিরবাজার মৎস্য আড়তে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে রয়েছে মাছের বৃহৎ পাইকারি বাজার। এর পেছন দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীপাড়ের বেশকিছু জায়গা দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন আড়তদাররা। তীরের একটি অংশে দেয়াল উঠিয়ে সীমানা আলাদা করে নেয়া হয়েছে। যার ১৫-২০ হাত জমি নদী অংশ। একই পরিমাণ জায়গা দখল করে বর্ধিত করা হয়েছে মাছের পাইকারি বাজারের আরেকটি অংশ।

নদীতীরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তীর দখল করে বাজার সম্প্রসারণে পরিবেশের ঝুঁকি বেড়েছে। এমনিতে ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে দখল। আজমান আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা দাবি করেন, এর আগেও বেশ কয়েকবার নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। খবর পাওয়ার পর প্রশাসন অভিযান চালিয়ে সেই স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। এবার দেয়াল দিয়ে দখল করা হয়েছে।

সুরমা নদী দখলের এ চিত্র নতুন নয় দাবি করে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শহীদুল ইসলাম শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও নদীর জায়গা দখল করে শৌচাগার হয়েছিল। অনেক লেখালেখির পর সেটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। দখলদারদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠবে।’

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশ-এর সংগঠক শুয়াইব হাসান বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও নদীর জায়গা দখল করে শৌচাগার গড়ে তুলেছিল ওই চক্রটি। আন্দোলনের মুখে সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা জানান, তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। জড়িতদের নোটিস দেবেন। দখল ছাড়াও আড়তের প্রতিদিনের আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে নদীতীরে। কাজিরবাজার অংশে সুরমা নদীতীরে সবসময় আবর্জনা জমে থাকে।

নদী দখল ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. এমরান হোসেন জানান, নদী দখলের বিষয়টি তার জানা নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন তিনি।

জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরজমিন পরিদর্শনে টিম পাঠাব। অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজন হলে দেয়াল ভেঙে দেয়া হবে।’