যারা একসময় নির্যাতিত ছিল, তারাই আজ গুমবিরোধী এই অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি তুলছে— এমন মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।

রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে আজ ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত ‘গুম প্রতিকার অধ্যাদেশ স্থগিত ও বিচারবিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল: সুশাসন ও মানবাধিকারের অগ্রযাত্রার প্রতি হুমকি’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শহিদুল আলম।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়। গুম প্রতিকার অধ্যাদেশ স্থগিত এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ সুশাসন ও মানবাধিকারের অগ্রযাত্রার জন্য সরাসরি হুমকি। ব্যক্তি বদলালেও যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কার না হয়, তবে পুরনো সংকটই নতুন রূপে ফিরে আসবে।

গুম প্রতিরোধের গুরুত্ব তুলে ধরে শহিদুল আলম বলেন, ‘যারা একসময় নির্যাতিত ছিল, তারাই আজ গুমবিরোধী এই অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি তুলছে—সম্ভবত তারা ভবিষ্যতে এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তারা আরও শক্তিশালী আইন আনতে চান। কিন্তু আমার প্রশ্ন—বর্তমান অধ্যাদেশটি আপাতত গ্রহণ করে পরে সংশোধন করতে সমস্যা কোথায় ছিল?’

গুমের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে আয়নাঘর পরিদর্শন করেছি। এর ভেতরের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একটি সভ্য সমাজে এমন কিছু গ্রহণযোগ্য নয়।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘গণভোটে জনগণ সম্মতি দেওয়ার পরও কেন এ অধ্যাদেশগুলো নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। ১৪ সদস্যের মধ্যে ১০ জন একমত থাকার পরও মাত্র ৩ জনের ভিন্নমতের দোহাই দিয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত করা অযৌক্তিক। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমাদের ইতিহাসে বারবার অভিশাপ হিসেবে এসেছে। এই “অ্যাবসলিউট পাওয়ার” মানুষকে কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে।’

অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘জুডিশিয়ারির স্বাধীনতা হলো সাংবিধানিক সরকারের ভিত্তিমূল। এই ভিত্তি নড়ে গেলে গণতন্ত্র টিকবে না। বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক হলেও আমাদের দেশে নির্বাহী বিভাগ সবসময় এটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।’

গুম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গুম হলো পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন—এটি এক ধরনের “স্টেট টেরর”। অথচ অধ্যাদেশ বাতিলের আলামত দেখে মনে হচ্ছে এর কোনো বিচারই হবে না। গুম প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল মানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুমের লাইসেন্স দেওয়া। কোনো অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে হয়।’

সংসদ সদস্য হাসানাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে নেমেছিলাম রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু ক্ষমতায় এলেই আমাদের মানসিকতা বদলে যায়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দুদকের নিরপেক্ষতা আমরা বিরোধী দলে থাকলে চাই, কিন্তু সরকারে এলে সব ভুলে যাই।’

অধ্যাদেশ স্থগিতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গুম তদন্ত আবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের হাতে ফিরে যাবে। বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি যদি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে স্বাধীন বিচার সম্ভব নয়।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘হাসিনা কোনো ব্যক্তি নয়, এটি একটি সিস্টেম। এই সিস্টেম রেখে দিলে আমরা নতুন “হাসিনা” তৈরি করব।’

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। কিন্তু এখন সরকার ও বিএনপি পুরনো বন্দোবস্তেই ফিরে যাচ্ছে। ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে পারে—এমন সংস্কারগুলো পাশ না করে বিএনপি কেবল নিজেদের সুবিধাজনক অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা হচ্ছে।’

ডা. তাসনিম জারা বলেন, ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিচার বিভাগ অতীতে বিরোধী দমনযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগটি ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু সেটি থেমে যাওয়ায় আমরা আবার পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি। গুমের তদন্তে যদি সরকারের অনুমতি নিতে হয়, তবে বিচার পাওয়া সম্ভব নয়। এটি এমন যে—চোর ধরতে চোরের সর্দারের অনুমতি নিতে হবে। আমাদের যেখানে অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা, সেখানে আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি। পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া সুশাসনের পথে বড় বাধা।’

অনুষ্ঠানে আরো অংশ নেন আইনজীবী মানজুর মতিন, এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহসহ অন্যরা।