জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি জেলা। এর মধ্যে যশোর থেকে গোপালগঞ্জ, গোপালগঞ্জ থেকে চাঁদপুর ও চাঁদপুর থেকে ফেনীর দক্ষিণাংশ আগামী ১০০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের অংশ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। এ পরিবর্তনটা আগামী অর্ধশত বছরের মধ্যেও হতে পারে বলে আশঙ্কা তার। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সারা দেশেই পড়ছে বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এক সংলাপে অংশ নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। ‘উপকূলের জীবন ও জীবিকা: সংকট ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় এ সংলাপের আয়োজন করে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)।
জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) এক প্রতিবেদনের আলোকে অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, ‘রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব—এ সারির মধ্যাঞ্চল লবণাক্ত হয়ে যাবে। ঢাকা শহর খুব উঁচু, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ২৫ ফুট। ঢাকা শহরের চারপাশও একসময় লবণাক্ত হয়ে যাবে। কামরাঙ্গীরচর বা জিঞ্জিরার উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট। এসব এলাকাও পানির তলায় চলে যেতে পারে।’
লবণাক্ততার সমস্যার কথা তুলে ধরে এ জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সম্মতি দেয়ার মধ্য দিয়ে লবণাক্ততা সমস্যার শুরু। কেননা ওই বাঁধের কারণে উজান থেকে পানি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে লবণাক্ততা বাড়া শুরু হয়েছে।’
ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘প্রকৃতি বদলাচ্ছে। আমাদের এ প্রকৃতিকে বুঝতে হবে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশ আজ চার ঋতুতে পরিণত হয়েছে। আষাঢ়েও এখন বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় না। ফলে জীবন-জীবিকায় সংকট বাড়ছে। উপকূলের মানুষ আজ ভালো নেই। আগামীতে উপকূলে জলোচ্ছ্বাস ও দুর্যোগ বাড়বে, যা মোকাবেলায় প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। এ কাজে কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা জলবায়ুর অভিঘাতে ভুক্তভোগীরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি, বর্জ্য থেকে পানিদূষণও ইলিশের অভয়াশ্রমের প্রবেশপথে নানা প্রকল্পে ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভরা মৌসুমে ইলিশের দেখা না মেলার মূল কারণ। পটুয়াখালীর কুয়াকাটাসংলগ্ন সমুদ্রে দীর্ঘ ডুবোচর, রাবনাবাদ, আগুনমুখা, আন্ধারমানিক এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ায় ইলিশের আনাগোনা কমে গেছে। কক্সবাজারসংলগ্ন মাতারবাড়ী অঞ্চলে উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ ও মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘নদী দখল করে প্রস্তুত করা স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নদী দখল করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না। নদী বাঁচাতে হবে। পরিবেশ বাঁচাতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
আয়োজক সংগঠন ধরার সহআহ্বায়ক শরমীন মুরশিদ বলেন, ‘নদী হলো পাবলিক প্রপার্টি। এ নদীতে বাঁধ দেয়া হচ্ছে কার সিদ্ধান্তে? আইন করে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। উপকূল রক্ষায় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উপকূলের কমিউনিটির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
মানুষই যদি না থাকে তাহলে উন্নয়ন দিয়ে কী করব—সংলাপে এমন প্রশ্ন রেখে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের বেসরকারি উপদেষ্টা এমএস সিদ্দিকী বলেন, ‘মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাঁচাতে হবে নদী ও পরিবেশকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।’
রোমান ক্যাথলিক চার্চ ঢাকার আর্চবিশপ বিজয় নিসফরাস ডি’ক্রুজের সভাপতিত্বে ও ধরার সদস্য সচিব শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় জাতীয় সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ আলী এবং ব্লু প্ল্যানেট ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপক মো. ইকবাল ফারুক।










