নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। এর ছয় মাসের মধ্যেই দেশ পুনর্গঠনে হাত বাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন বন্ধু দেশ। এবারের বিজয় দিবস উপলক্ষে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রথম পর্ব
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন বসিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। স্বাধীনতার পর সেই মাইন অপসারণে এগিয়ে আসে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুধু মাইন অপসারণই নয়, খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে উন্নয়ন সহযোগিতাসহ নানাভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় তারা।
সেই সময় চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধার ও মাইন অপসারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়। যদিও এ কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে গুঞ্জন উঠেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ-ঘাঁটি করতে চায়। পশ্চিমা সোভিয়েতবিরোধী দেশগুলোও বিষয়টিতে নড়েচড়ে বসেছিল।
ঠিক এমন মুহূর্তে ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশসহ গোটা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই যেকোনো ধরনের সামরিক (নৌ, বিমান ও স্থল) ঘাঁটি তৈরির ঘোর বিরোধিতা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি। একই বক্তব্য দেয়া হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও।
ইন্দিরা গান্ধীর ১৭-১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফরের শেষে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রাখা উচিত বলে ঘোষণা করছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ অঞ্চলে যেকোনো স্থল, বিমান, নৌ-ঘাঁটি তৈরিতে তারা বিরোধিতা করেন। এর মধ্য দিয়েই গোটা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীন ও নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা যাবে বলে বিশ্বাস করছেন তারা। একই সঙ্গে এটিকে উপকূলবর্তী দেশগুলোর উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন তারা। পাশাপাশি ভারত মহাসাগরকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়েও দুই প্রধানমন্ত্রী তাদের সংকল্প প্রকাশ করেছেন।’
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের মার্চের শুরুর দিকে পাঁচদিনের সফরে মস্কো যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার এ সফর চলাকালে ভিয়েতনামের কমিউনিস্টদের পক্ষে সাত দফা, বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণসহ আরো কয়েকটি বিষয়ে একমত প্রকাশ করে বক্তব্য রাখে বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন।
বঙ্গবন্ধুর ওই সফর চলাকালে বাংলাদেশকে ৫২ মিলিয়ন ডলার ত্রাণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা দিতে রাজি হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের ফ্যাক্টরি এবং রেডিও ট্রান্সমিটার। সেই সঙ্গে স্বাধীনতার ১০ বছর আগে বাংলাদেশে শুরু করা জ্বালানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেয় দেশটি। এছাড়া ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে পরে আরো ১০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণা দেয়।
ওই সময় কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা বা চুক্তির কথা উল্লেখ না করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রহের কথা বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র সে সময় এ ধরনের যেকোনো পরিকল্পনার বিপরীতে জোর অবস্থান নেয়ায় বিষয়টি নিয়ে আর এগোয়নি সোভিয়েত ইউনিয়ন।
আবার বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রীও অটুট রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্রুত স্বীকৃতি দেয়া থেকে শুরু করে বাণিজ্য চুক্তি সই, ত্রাণ-অনুদান বিতরণসহ নানাভাবেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়টিতে বাংলাদেশের পাশে ছিল তারা। তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব-জার্মানি ও বুলগেরিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলো। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন করে ১৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য বিনিময়ের চুক্তি।
এছাড়া দেশটি সে সময় বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের দিকেও বেশ মনোযোগী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য সোভিয়েত বৃত্তি, এখানকার গণমাধ্যমে সোভিয়েত সিনেমার প্রদর্শনী, দুই দেশের ট্রেড ইউনিয়ন পর্যায়ের নানা কার্যক্রম ও ভ্রমণসহ নাগরিক পর্যায়ে নানাভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে আসে দেশটি।
আর চট্টগ্রাম বন্দরে দেশটির নাবিকরা মাইন অপসারণ শুরু করেন ১৯৭২ সালের এপ্রিলে। এ কার্যক্রম চলে ১৯৭৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ মাইন অপসারণ কার্যক্রম চলাকালে এক সোভিয়েত নাবিকের মৃত্যু হয়। ২৬ মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ করেছিলেন সোভিয়েত নৌবাহিনীর আট শতাধিক নাবিক।










