মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ঘাটতি, আর্থসামাজিক বিভিন্ন পরিবর্তন, ডিজিটাল মিডিয়ার আধিপত্য, পাঠকের রুচির পরিবর্তনসহ আরো কিছু প্রভাবককে দায়ী করছেন প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টরা। পরপর কয়েক বছর একুশে বইমেলায়ও বই বিক্রি কমেছে। অনেক প্রকাশক জানিয়েছেন, শুধু সৃজনশীল বই বিক্রি করে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশকদের টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে উঠেছে।

অবশ্য বিপরীত চিত্রও আছে। ‘ভাইরাল লেখক’-এর বইকে পুঁজি করে ব্যবসায়িকভাবে সফল হচ্ছেন অনেক প্রকাশক। বাংলাবাজার ঘুরে এ পরিস্থিতির বাস্তবতা পাওয়া গেছে। পুরনো প্রকাশনা তাদের অভিজ্ঞতা, ব্র্যান্ড ভ্যালু, দীর্ঘদিনের খ্যাতিমান লেখকদের বই, নিজস্ব ছাপাখানা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপর ভর করে ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন। তবে তাদের বাজার ও বার্ষিক বিক্রি সংকুচিত হয়েছে। মাঝারি আকারের প্রকাশনাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

অন্যদিকে তুলনামূলক নতুন অনেক প্রকাশক পাণ্ডুলিপির মানের চেয়ে ‘মার্কেটিং হাইপ’কে কাজে লাগাচ্ছেন ব্যবসার কৌশল হিসেবে। বিশেষ করে ১৭-২৩ বছর বয়সী পাঠককে লক্ষ্য করে এ বিপণন কৌশল সাজানো হচ্ছে, যারা ফেসবুক বা অনলাইনে পোস্ট করতে ও গল্পের ছোট কিস্তি পড়তে অভ্যস্ত। ফেসবুকে লিখে অনেক তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। অনেক প্রকাশক এ লেখকদের বই প্রকাশ করে অনলাইন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্য ঘরে তুলছেন। এসএসসি বা এইচএসসি শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায়ই অনেকে হচ্ছেন ‘ভাইরাল লেখক’। তাদের পাঠকগোষ্ঠীও মূলত সমবয়সীরা। তাদের বই প্রকাশের পর পরই হাজার হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে।

প্রকাশকদের দেয়া তথ্যমতে, কভিড-পরবর্তী সময়ে সৃজনশীল বইয়ের বাজারে বিক্রি কমেছে ব্যাপকভাবে। প্রকাশনাভেদে তাদের বিক্রি কমেছে ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। অনেক প্রকাশক জানাচ্ছেন যে বর্তমানে তাদের বার্ষিক বিক্রি নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশে।

নাম প্রকাশ না করে ঢাকার একজন প্রকাশক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বণিক বার্তার কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, কভিডের আগে তার ৩০০-৪০০টি বইয়ের ক্যাটালগের ওপর শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক বিক্রিই ছিল ৫০-৬০ লাখ টাকা। বার্ষিক বিক্রি ছিল প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। বর্তমানে তার টাইটেল ক্যাটালগের সংখ্যা বেড়ে ৬০০ হলেও করোনার পর থেকে বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।

অনুপম প্রকাশনীর প্রকাশক মিলন কান্তি নাথ প্রকাশনা ব্যবসায় আছেন প্রায় ৪৬ বছর। তিনি বলেন, ‘কভিডের পর থেকেই এ শিল্পে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে অনেক প্রকাশনীর বার্ষিক আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সৃজনশীল প্রকাশনার কেউ-ই করোনার পর কোনো বইমেলা থেকে স্বস্তি নিয়ে ফিরতে পারেননি।’

বইয়ের বাজারের অবস্থাকে ‘নাজুক’ বলে বর্ণনা করেছেন অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘বড় বড় উজ্জ্বল শোরুম আসলে এ শিল্পের প্রকৃত দৈন্যদশা ঢেকে রাখছে। শতভাগ সৃজনশীল বইয়ের ওপর ভিত্তি করে এখনকার দিনে বড় আউটলেট চালানো কার্যত অসম্ভব। এ সংকটের কারণে বাংলাবাজারে অনেক মূলধারার প্রকাশক এরই মধ্যে তাদের দোকান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন অথবা পাশাপাশি অন্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অনিয়ন্ত্রিত পাইরেসি এবং দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি’ বাস্তবায়ন না হওয়া এ ধসের অন্যতম প্রধান কারণ।’

এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে আবার কেউ নতুন প্রকাশনা খুলে ফেসবুকের ‘ভাইরাল’ সাহিত্যের ওপর নির্ভর করছেন। ফেসবুকে লেখকের রিচ দেখে বইয়ের সম্ভাব্য বিক্রি অনুমান করার মাধ্যমে তারা তাদের প্রকাশনার তালিকা তৈরি করছেন।

ভূমি প্রকাশের সুলতান আজম সজল বলেন, ‘‌সৃজনশীল বইয়ের বাজার সংকুচিত এবং উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সেজন্য বর্তমানে ‘মার্কেটিং হাইপ’ সাহিত্য বিশেষ করে—রোমান্টিক ও রহস্য, রোমাঞ্চ সিরিজ, অনুবাদ প্রকাশের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে ফেসবুক ও টিকটকে জনপ্রিয় হওয়া লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।’

অন্যধারা গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় ও ভাইরাল লেখকের বই প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছে। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান সময় অনুযায়ী লেখক ধরে কাজ করতে পারলে সব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরই বিক্রি আছে। করোনার পর বাজারে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রচুর নতুন লেখক ফেসবুকে গল্প লেখা শুরু করেছেন এবং পাঠক সেগুলো পড়েছেন। ২০১৯-২০ সালের ফেসবুকে লেখা গল্প যখন ২০২৪-২৫ সালে বই আকারে আসছে, তখন বাজারে সেগুলোর বিরাট চাহিদা তৈরি হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২৩-২৪ সালের পর যেসব নতুন প্রকাশনা সংস্থা এ ট্রেন্ড ধরতে পেরেছে, যাদের কাছে ভাইরাল বা হাইপ তোলা বই আছে তারাই ভালো ব্যবসা করছে।’

এ ‘ভাইরাল’ কৌশলের বিপরীতে পুরনো বড় প্রকাশনাগুলো তাদের দীর্ঘদিনের তৈরি করা ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’র ওপর ভর করে টিকে আছে। হyমায়ূন আহমেদের ‘‌‌অপেক্ষা’ বা ‘দেয়াল’-এর মতো উপন্যাস এখনো মাসে দুই থেকে তিন হাজার কপি বিক্রি হয়। তবে শুধু পুরনো বই বিক্রি করে প্রকাশনা সংস্থা টেকে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন অভিজ্ঞ প্রকাশক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বড় প্রকাশনাগুলো শুধু পুরনো লেখকদের ওপর নির্ভর করে না; টিকে থাকার জন্য তাদের দরকার বাজার চলতি বই ও সুসাহিত্য—দুটির সমন্বয়। সারাক্ষণ শুধু বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকলে এক ধরনের ব্যবসা হবে, কিন্তু সাহিত্যের মান বজায় রেখে নতুনদের প্রমোট করার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি সফলতা আসে। আমরা হয়তো ভাইরাল হওয়া লেখকদের পেছনে অন্ধভাবে ছুটি না, কিন্তু আমরা এমন লেখক তৈরি করার চেষ্টা করি যারা পরবর্তী সময়ে বড় পরিসরে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেন।’

ঐতিহ্য’র প্রকাশক আরিফুর রহমান নাঈমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সাহিত্যমান বিচারের মাপকাঠি সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তায় স্থানান্তর হয়েছে। তবে প্রকাশনা ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে “‍বাজার চলতি” ভাইরাল বই এবং “‍মানসম্মত সাহিত্য”—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কারণ অধিক বিক্রি হওয়া মানেই তা ভালো সাহিত্য নয়; বাজার এবং সাহিত্যের মান সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।’

দেশের বই বাজারের চলমান সংকটকে কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং একটি জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন আদর্শের প্রকাশক মাহবুবুর রহমান। তরুণ এ প্রকাশক বলেন, ‘ভাইরাল হওয়াটা কোনো সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হলো কনটেন্টের স্থায়িত্ব এবং মান নিয়ে। যদি কোনো কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার পরও তার সাহিত্যিক মান বজায় থাকে এবং সেটি ৪০-৫০ বছর ধরে প্রাসঙ্গিক থাকে, তবে তাকে নেতিবাচকভাবে দেখার অবকাশ নেই। তবে বর্তমানে যে ভাইরাল ট্রেন্ড চলছে, সেখানে কনটেন্টের মান জাতীয় রুচির “‍মারাত্মক অবক্ষয়” এবং প্রকাশকদের যথাযথ সম্পাদনা ও পাণ্ডুলিপি “‍নার্সিং”-এর অভাবেরই প্রতিফলন।’

জাতীয়ভাবে মানুষের বই পড়ার আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতিগত জ্ঞানচর্চার অভাবে সৃজনশীল বইয়ের বিক্রি গড়ে ৭০ শতাংশ কমেছে। এটা এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের প্রতিফলন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোনো বিষয়ে সুশৃঙ্খল বা পদ্ধতিগত উপায়ে জ্ঞান অর্জনের প্রতি একটি জাতীয় অনীহা তৈরি হয়েছে। এ জ্ঞানবিমুখতা কেবল বই বিক্রির ধস নয়, বরং জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।’

প্রকাশকদের বড় আকারের বিক্রি নির্ভর করে সরকারি বই ক্রয়ের ওপর। এক্ষেত্রে প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কমেছে হিস্যা। এর বাইরে বিভিন্ন সময় বইয়ের বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং একটি সুনির্দিষ্ট “‍মেরিট বেজড” বা মেধাভিত্তিক নীতিমালা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এমন একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেখানে নির্বাচক কমিটিতে থাকা ব্যক্তিদের নিজস্ব বই ক্রয়ের তালিকায় থাকবে না। “‍পাবলিক মানি” বা জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহারের জন্য নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়া অপরিহার্য।’

দেশের প্রকাশনা জগতের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকাশনা একটি বিশেষায়িত পেশা হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে কোনো “‍চেক অ্যান্ড ব্যালান্স” নেই। যে কেউ চাইলেই টাকা বিনিয়োগ করে প্রকাশক হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু সম্পাদনা, রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা বা বিপণন সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। পেশাদারত্বের এ অভাব দীর্ঘমেয়াদে বইয়ের গুণগত মান কমিয়ে দিচ্ছে।’

এ প্রকাশকের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য একটি শক্তিশালী ‘রিভিউ কালচার’ বা বই সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নতুন ও পুরনো প্রকাশকদের মধ্যে গঠনমূলক আদান-প্রদান প্রকাশনা শিল্পকে একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম বলেন, ‘‌বর্তমান প্রকাশনা শিল্পে সৃজনশীলতার চেয়ে “‍ভাইরাল হাইপ” বা ব্যবসায়িক মুনাফাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে কোনো কোনো প্রকাশক অপরাধী বা নেতিবাচকভাবে আলোচিত ব্যক্তিদের বইও প্রচার করছেন, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং আদর্শগতভাবে সঠিক নয়। কেবল আইন বা নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মানহীন বইয়ের প্রসার রোধ করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং মানসম্মত সাহিত্যের প্রসারে পাঠচক্র ও পাঠ কার্যক্রম বাড়ানোর মতো সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।’