ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদন হয়, তার ৮০ শতাংশ অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের। ফলে বাকি ২০ শতাংশ বর্জ্য দৈনিক পড়ে থাকছে ঢাকার একাংশের রাস্তায়। যার কারণে দক্ষিণ সিটির সড়ক-মহাসড়কগুলোতে বেড়ে গেছে দৃশ্যমান বর্জ্যের পরিমাণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকবল সংকট ও যান-যন্ত্রপাতির অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন পর্যন্ত বর্জ্য উত্পন্ন হয়। তিনটি হুইল ডোজার, পাঁচটি এক্সক্যাভেটর, পাঁচটি বুলডোজারের মাধ্যমে দৈনিক ৭০০ ট্রিপে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টন বর্জ্য অপসারণ করে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। বাকি বর্জ্য পড়ে থাকে পরদিন অপসারণ প্রক্রিয়ার অপেক্ষায়। পরদিন আবার নতুন বর্জ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় আগের দিনের বাকি বর্জ্যের চাপ। ফলে কোনোদিনই পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন দেখা যায় না ডিএসসিসির আওতাভুক্ত সব ডাস্টবিন।

জানা গেছে, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দুই সিটিতেই ময়লা সংগ্রহ বাবদ ফি বাড়ায় সংশ্লিষ্টরা। ৩০ থেকে হঠাৎ ১০০ টাকা করা হয় ময়লা সংগ্রহের ফি। অভিযোগ ওঠে উত্তর সিটি করপোরেশনের কোথাও কোথাও ২০০-৩০০ টাকাও ময়লার বিল নেয়া হয়। টাকা বাড়ানোর ছয় মাস না যেতেই নতুন অভিযোগ ওঠে যে দুই সিটিতেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নিয়মিত ময়লা নিচ্ছেন না। এতে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক সর্বত্রই বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেশি খারাপ অবস্থা ঢাকা দক্ষিণের।

সম্প্রতি ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, সড়কে দৃশ্যমান বর্জ্য দেখতে চান না তিনি। অথচ তার নির্দেশনার পরও কমেনি দৃশ্যমান বর্জ্যের পরিমাণ। উল্টো এমন সব রাস্তায় বর্জ্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে আগে কখনই বর্জ্য দৃশ্যমান ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার টিএসসি থেকে শেখ রাসেল টাওয়ার সড়কের সামনে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়ার দনিয়া কলেজের সামনে, বাড্ডা থেকে ডেমরা যাওয়ার পথে, জুরাইন নতুন রাস্তা, দয়াগঞ্জসহ রাজধানীর অনেক সড়ক-মহাসড়কেই নতুন করে দৃশ্যমান বর্জ্যের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এছাড়া দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেই গৃহস্থালি বর্জ্য নিয়মিত না নেয়ায় অভিযোগ করেছেন নগরবাসী।

রাজধানীর জুরাইন, পোস্তগোলা, মুরাদপুর, গেন্ডারিয়া, মিরহাজিরবাগ, বাংলাবাজার, ইসলামপুর, লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, লালবাগসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়ির সামনেই কয়েকদিনের বর্জ্য পড়ে আছে। বর্জ্য জমে থাকায় পথচারীদের রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধা হয়। বৃষ্টি হলে এসব বর্জ্য পানির সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ড্রেন ও খালের মুখ বন্ধ হয়ে পানি নিষ্কাশনও বাধাগ্রস্ত হয়।

তাঁতীবাজারের বাসিন্দা তানজিলা আক্তার বলেন, মাস শেষ না হতেই ময়লার টাকা নেয়ার জন্য লোকজন এসে হাজির হয়ে যায়, কিন্তু নিয়মিত ময়লা নেয়ার বেলায় খবর থাকে না তাদের। শাঁখারীবাজারের বাসিন্দা চৈতালী রায় বলেন, তিন-চারদিন পরপর লোকজন ময়লা নিতে আসে। কখনো কখনো সপ্তাহও পেরিয়ে যায় ময়লা নেয়ার লোক আসে না। গরমে ময়লা থেকে তীব্র গন্ধ ছোটে। তখন রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলাই দায় হয়ে যায়।

একই কথা বললেন জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। তিনি জানান, তাদের এলাকায় সপ্তাহে একবার ময়লা নিতে আসে। সাতদিন ময়লা জমে বাজে অবস্থা হয়ে যায়। লালবাগের বাসিন্দা হালিমা আক্তার বলেন, টাকা বাড়ানোর আগে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বাসা থেকে ডেকে ময়লা নিয়ে যেত। টাকা বাড়ানোর পর উল্টো ভোগান্তি আরো বেড়েছে। এখন বাসার সামনে ময়লা রেখে আসতে হয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা তাদের ইচ্ছেমতো সময়ে এসে ময়লা নিয়ে যায়। যদি নিয়মিত ময়লা নিত তাহলেও মানা যেত। দিনের পর দিন বাড়ির সামনে ময়লার স্তূপ জমতে থাকে। বিষয়টি খুবই বিব্রতকর।

ডিএসসিসির একটি সূত্র বলছে, ময়লা সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের। সে কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত যান-যন্ত্রপাতির অভাবকেও দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগটির কর্মকর্তারা।

বেহাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. বদরুল আমিন বিউপি বণিক বার্তাকে বলেন, এর সুনির্দিষ্ট কারণ হলো আমাদের লোকবল কম। যান-যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। এর মধ্যে নতুন সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের বর্জ্যের দায়িত্বও আমাদের হাতে পড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের কাউন্সিলররা এসটিএসের (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) জায়গাগুলো এখনো বুঝে পাননি। ফলে বাসাবাড়ির আঙিনায় দৃশ্যমান বর্জ্য বেড়ে গেছে।

হঠাৎ সড়ক-মহাসড়কে দৃশ্যমান বর্জ্য বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বর্তমান লোকবল ও যান-যন্ত্রপাতি দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বর্জ্য অপসারণ করতে পারছি। প্রতিদিন যদি সড়ক ও অলিগলিতে ২০ শতাংশ বর্জ্য জমা হয়, তাহলে মাসে ও বছরের পরিসংখ্যানে হিসাব করলে শিউরে উঠতে হয়। তবে চলমান সংকট মোকাবেলায় যান-যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাসও দেন এ কর্মকর্তা।