মহাসড়ক নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নকশা প্রণয়ন। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সড়কের নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আদর্শ মানদণ্ড মেনে চলা হয়। বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরও ‘জিওমেট্রিক ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডস’ শিরোনামে নিজস্ব মানদণ্ড তৈরি করেছে। উন্নত দেশগুলোর নকশায় অনুসৃত বিষয়ের প্রায় সবই এ মানদণ্ডে রাখা হয়েছে। তবে এ মানদণ্ডের অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমেই। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সড়কের নকশা প্রণয়ন করতে গিয়ে এ মানদণ্ড মানছে না সওজ নিজেই।

সড়ক-মহাসড়কের নকশা প্রণয়নের সময় বেশকিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সড়কের গতিপথ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ট্রাফিক, যানবাহনের গতি, নিরাপত্তা ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সড়কের গতিপথ। সওজের মানদণ্ড অনুযায়ী, নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সেটিকে যতটা সম্ভব সোজা রাখতে হবে। পুরনো সড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় চোখে পড়ে না। দেশের বেশির ভাগ মহাসড়কের গতিপথ আঁকাবাঁকা। থেকে গিয়েছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। এসবের জন্য দায়ী করা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ নকশাকে। পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায় সড়কের গতিপথ তৈরির অভিযোগও।

সড়কের নকশা করতে হয় পথচারী, অযান্ত্রিক গাড়িসহ সবার জন্য। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সর্বনিম্ন মাত্রায় সীমিত রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হয়। চালক বা পথচারীসহ সড়কে সবাই যাতে দূর থেকেই সব যানবাহন চলাচল দেখতে পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয়। চৌরাস্তার নকশা এমনভাবে করতে হয়, যাতে গাড়ি স্বাভাবিক গতিতেই তা পার হতে পারে। সওজের নকশার মানদণ্ডেও এসব বিষয় রাখা হয়েছে। যদিও দেশের সড়ক-মহাসড়কে এর তেমন কোনো প্রতিফলন নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, মহাসড়ক নির্মাণের আগে পরিকল্পনা করা হয় সেই মহাসড়কটিতে ভবিষ্যতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কী পরিমাণ গাড়ি চলাচল করবে। এটার ওপর ভিত্তি করেই মহাসড়কের ধাপ থেকে শুরু করে যাবতীয় নকশা তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সড়কের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে কাজটি সহজ করে দিয়েছে সফটওয়্যারভিত্তিক বিভিন্ন ‘টুল’। এসব টুল ব্যবহার করে বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ ট্রাফিক ডাটা, ট্রিপের ধরন, আবহাওয়াসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে সবচেয়ে উপযোগী নকশা বেছে নেন প্রকৌশলীরা। তবে বাংলাদেশে বেশির ভাগ সড়কের নকশা তৈরির কাজে ব্যবহার হচ্ছে ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা তথ্য। দুর্বল নকশার কারণে আমাদের সড়কগুলোও দুর্বল হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চার লেনের মহাসড়কের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। তবে এসব মহাসড়কের নকশায়ও রয়ে গেছে বড় ধরনের ত্রুটি। চার লেন মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিডিয়ান। নকশায় মিডিয়ানের প্রশস্ততা বা ইউটার্ন নির্ধারণ করতে হয় ট্রাফিকের ধরনের ওপর নির্ভর করে। এজন্য অঞ্চল বা দেশভেদে এগুলোর ধরনও ভিন্ন হয়। তবে সবখানেই গুরুত্ব পায় সর্বোচ্চ সড়ক নিরাপত্তা।

কিন্তু বাংলাদেশের চার লেন সড়কের মিডিয়ানগুলোর নকশা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, সদ্য চালুকৃত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মিডিয়ানের নকশা ত্রুটিপূর্ণ। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মিডিয়ান কেটে ইচ্ছামতো বানানো হয়েছে ইউটার্ন, যেগুলোয় প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

সওজের জিওমেট্রিক ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডসে বাস-বে ও বাসস্ট্যান্ড নিয়েও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে জরিপ ও গবেষণা করে তারপর বাস-বে ও বাসস্ট্যান্ডের স্থান নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোর নকশায় বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে। ফলে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে বাসস্ট্যান্ড। এ কারণে মহাসড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে যানজট।

বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো বিশৃঙ্খল ও যানজটপ্রবণ হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফিডার রোড। কিন্তু জাতীয় মহাসড়কগুলোয় ফিডার সড়কগুলোর সংযোগস্থল কেমন হবে, সেটিই এখনো ঠিক করতে পারেনি দেশের সড়ক নির্মাতা সংস্থাগুলো।

এছাড়া দেশের মহাসড়কের মূল কাঠামোর নকশাও সঠিকভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি জাতীয় বা আঞ্চলিক মহাসড়ক গড়ে তোলা হয় নিচ থেকে কয়েকটি ধাপে। এসব ধাপ বা স্তরের মধ্যে রয়েছে ইমপ্রুভড সাবগ্রেড, বেজ কোর্স, এগ্রিগেট বেজ কোর্স, বাইন্ডার্স কোর্স, ওয়্যারিং কোর্স ইত্যাদি। এসব ধাপের প্রতিটিরই আদর্শ পুরুত্ব নির্ধারণ করা রয়েছে। এক্ষেত্রে চার লেনের মহাসড়কে ৩০০ মিলিমিটার পুরুত্বের ইমপ্রুভড সাবগ্রেড, ৩০০ মিলিমিটার পুরুত্বের বেজ কোর্স, ৪০০ মিলিমিটার পুরুত্বের এগ্রিগেট বেজ কোর্স, ১০০ মিলিমিটারের বাইন্ডার্স কোর্স ও ৬০ মিলিমিটারের ওয়্যারিং কোর্স নির্মাণের নিয়ম রয়েছে। এটি বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত আদর্শ মান। তবে বাংলাদেশে মহাসড়কের নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ আদর্শ মান অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যায়। একই সঙ্গে ঠিকাদাররাও অনেক ক্ষেত্রে এ মান অনুসরণ করে সড়ক নির্মাণ করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মহাসড়ক নির্মাণে নকশাগত এসব ত্রুটির বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর পর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এটা সব ক্ষেত্রে হয় না। কিছু ক্ষেত্রে হয়। সমস্যা দেখা দিলে পরে তা আমরা সংশোধন করে নিই এবং ভবিষ্যতে যেন একই সমস্যা আর না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে সড়ক-মহাসড়কের নকশা প্রণয়নের বিষয়টিতে আমরা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছি।