তিন সন্তানের জননী সাবানা বেগম। বড় মেয়ের বয়স এখন ১৪। অথচ ওই বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে তাকে। দুই বছরের মাথায় হয়েছেন প্রথম সন্তানের মা। পরে ফের জন্ম দেন যমজ সন্তান। সন্তানদের বয়সের ব্যবধান প্রায় এক যুগ।

স্বামী লায়েব উদ্দিন পেশায় কৃষক। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নরসিংহপুর নন্দনপুরের বাসিন্দা এ দম্পতি। তিন সন্তান নিয়ে বেশ আনন্দেই দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু একসময় সেই আনন্দ বিষাদে ভরে যায়। আড়াই বছরেও অবলম্বন ছাড়া দাঁড়াতেই শেখেনি ছেলে আফ্রিদ জাহান শান্ত ও মেয়ে সানজিদা আক্তার শান্তা।

এই যমজকে নিয়ে সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নেয়া হয়। সেখানে এসে জানতে পারেন বাচ্চারা মস্তিষ্কের জন্মগত অসংগতি নিয়ে বেড়ে উঠছে। তবে এটি যে একটি রোগ তা ঘুণাক্ষরে টের পাননি গৃহিণী সাবানা খাতুন। 

সাবানা জানান, প্রসব বেদনা নিয়ে তিনি স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথমে ছেলে সন্তানের জন্য দেন। জন্মের সময় সন্তানের এক পা আগে বেরিয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। পরে মেয়ে জন্ম নেয়। দুই বছর ছয় মাস বয়স হলেও দুই সন্তানের কেউ-ই অবলম্বন ছাড়া দাঁড়াতে পারছে না। সেইভাবে কথাও ফোটেনি মুখে। 

এই দুই শিশু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন রামেক হাসপাতাল শিশু বিকাশ কেন্দ্রের চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট রোকসানা আক্তার। তিনি বলেন, এটি এক ধরনের স্নায়ুরোগ। জন্মের সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব এই রোগের কারণ। গর্ভে বাচ্চা উল্টো অবস্থায় থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয় না। এতে বাচ্চাদের সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। 

রোকসানা আক্তার বলেন, ‘‌সেরিব্রাল পালসি হলে শিশুর হাত ও পা ভারী হয়। অনেক সময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে পারে না। কোনো কিছু আঁকড়ে ধরতেও অসুবিধা হয়। বসা, হামাগুড়ি দেয়া এবং হাঁটা বিলম্বিত হয়। সময়মতো শিশুর মুখে কথাও ফোটে না। এক কথায় সবকিছুই বিলম্বিত হয়।

তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রামেক হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু হয়। এখানে চিকিৎসা পাচ্ছে মস্তিষ্ক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন শিশু-কিশোর। গত ৯ মে পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা নিয়েছে ১৯ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার শিশু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। 

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ২০১৭-২২ পর্যন্ত তিন বছরের গড় অনুযায়ী পাঁচ বছরের নিচে জীবিত শিশু জন্মের পর মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৩ থেকে নেমেছে ৩১-এ। এক বছরের কম বয়সের শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫ জন। এছাড়া এক মাসের কম বয়সের শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২০ জন।

শিশু মৃত্যুর হার কমলেও রাজশাহী অঞ্চলে সেরিব্রাল পালসি আক্রান্তের হার বাড়ছে বলে জানান রোকসানা আক্তার।  

এদিকে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে শিশুদের সেরিব্রাল পালসি নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। তবে রাজশাহী নগরীর ১৫টি বস্তি এলাকা নিয়ে গবেষণা জরিপ চালিয়েছে একদল গবেষক। ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য নেন গবেষকরা। ভারতীয় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মেডিকেল ও ডেন্টাল সায়েন্স’ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এ গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

গবেষক দলটির প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষক বিপাশা রানী মহন্ত। তিনি বলেন, তারা সরাসরি গিয়ে বস্তিবাসী ৩৬১ মায়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। এদের মধ্যে ২৬৩ মায়ের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগেই। শতকরা হিসাবে তা ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। এদের প্রায় অর্ধেকই সাক্ষরজ্ঞানহীন এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য।

৮৪ শতাংশ মা টিটেনাস ভ্যাকসিন নেন। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করান ৭৪ শতাংশ মা। তা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় প্রসব বেদনা নিয়ে বাড়িতে সন্তান প্রসব করান ২৯১ জন মা। শতকরা হিসাবে যা দাঁড়ায় ৮০ শতাংশের ওপরে।

এর মধ্যে ২১ জন মা সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত সন্তান জন্ম দেন। এছাড়া অস্ত্রোপচারে জন্ম নেয়া ৭০ শিশুর মধ্যে নয় শিশুর শরীরে সেরিব্রাল পালসি পাওয়া যায়। সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ৩০ শিশুর মধ্যে ১৫টি বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। এছাড়া ১০ শিশু দ্বিতীয় এবং পাঁছ শিশু তৃতীয়।

এই গবেষক আরো জানান, অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে বাড়িতে সন্তান জন্মদান, প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী যথাযথ সেবার অভাবেই সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত সন্তান জন্ম নিচ্ছে। কেবল জনসচেতনতায় এটি রোধ সম্ভব। 

তবে ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে সর্বশেষ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ। ২০২২ সালের এ জরিপে উঠে এসেছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তায় প্রসবের হার বিগত বছরগুলোর তুলনার বৃদ্ধির বিষয়টি। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী ৭০ শতাংশ প্রসবই একজন দক্ষ সেবাদানকারীর সহায়তা ঘটছে। এছাড়া ৬৫ শতাংশ প্রসব কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হচ্ছে, যা ২০১৭ সালে ছিল ৫১ শতাংশ। 

৮৮ শতাংশ মহিলা অন্তত একবার একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর থেকে গর্ভকালীন বা এএনসি সেবা গ্রহণ করেছেন, যা ২০১৭ সালে ছিল ৮২ শতাংশ। কিন্তু কভিড-১৯ চলাকালীন চারবারের অধিক গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি গ্রহণ করেছেন—এ সংখ্যা ৪৭ থেকে হ্রাস পেয়ে ৪১ শতাংশে নেমে এসেছিল।

জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রোকেয়া খাতুন বলেন,  ‘‌প্রসব প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না হলে প্রসব বেদনা ১৮ ঘণ্টার বেশি অর্থাৎ দীর্ঘ হয়। কাজেই ১২ ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চা প্রসব না হলে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে।’ 

তবে কেবল প্রসবকালীন জটিলতা থেকে শিশু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হতে পারে বিষয়টি তেমন নয় বলে জানান রাজশাহীর প্রবীণ নবজাতক ও শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবি সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘‌অনেক সময় গর্ভকালীন সমস্যা থেকে শিশু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হয়। আবার জন্মের পরও  আক্রান্ত হতে পারে।’ 

এদিকে বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ-২০২২ অনুযায়ী, ১৬ বছর বয়সের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে রাজশাহী বিভাগের দুই-পঞ্চমাংশ নারী। বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালক ডা. এনামুল হক বলেন, ‘‌২২-৩০ বছর বয়স গর্ভধারণের জন্য উপযুক্ত সময়। এর আগে কিংবা পরে গর্ভধারণ করলে মা নানা ধরনের জটিলতায় ভোগেন।’ 

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৩ দশমিক ৭ শিশু সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। সে হিসাবে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ, যা অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি।

নিরাপদ প্রসব শিশুর সেরিব্রাল পালসি কমিয়ে আনতে পারে বলে নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের উপপরিচালক ডা. আনোয়ারুল কবীর। প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপদ প্রসব অনেকাংশে সেরিব্রাল পালসি কমিয়ে আনতে পারে।