মোট মজুরি থেকে মূল্যস্ফীতির হার সমন্বয় করে হিসাব করা হয় প্রকৃত মজুরি। ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর দেশে প্রকৃত মজুরি বাড়লেও ২০২২ সালে তা কমেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

আইএলওর ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্ট ২০২২-২৩: ইমপ্যাক্ট অব ইনফ্লেশন অ্যান্ড কভিড-১৯ অন ওয়েজেস অ্যান্ড পারচেজিং পাওয়ার’-এ বলা হয়, একাধিক বৈশ্বিক সংকটের মুখে বিশ্বব্যাপী প্রকৃত মজুরির নেতিবাচক পরিস্থিতি দেখা গেছে। এ বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

আইএলও বলছে, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হলো বছরে বছরে সব কর্মচারীর মাসিক গড় মজুরির পরিবর্তন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী মাসিক মজুরি শূন্য দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে। চলতি শতাব্দীতে এ বছরেই প্রথমবারের মতো প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি নেতিবাচক হয়। উন্নত জি২০ দেশগুলোর মধ্যে গত বছরের প্রথমার্ধে প্রকৃত মজুরি ২ দশমিক ২ শতাংশ কমে বলে ধারণা করা হয়। উদীয়মান জি২০ দেশগুলোতে প্রকৃত মজুরি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কভিড-১৯ মহামারীর আগের বছর ২০১৯ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কম।

আইএলওর প্রতিবেদনে আঞ্চলিক প্রকৃত মজুরি পরিস্থিতির পাশাপাশি সংস্থাটির বিশ্লেষণে ব্যবহূত তথ্যে ছিল বাংলাদেশসহ ১৩০টিরও বেশি দেশের মাসিক গড় নমিনাল মজুরি ও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান। এতে দেখা যায়, গত চার বছরে বাংলাদেশে মাসিক গড় নমিনাল মজুরি প্রতি বছরই বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) তথ্যসূত্র উল্লেখ করে আইএলও বলেছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মাসিক গড় নমিনাল মজুরি ছিল ১১ হাজার ২৮১ টাকা, ২০১৯ সালে ১২ হাজার ৪ টাকা এবং ২০২০ সালে হয় ১২ হাজার ৭৩২ টাকা। ২০২১ সালে মাসিক গড় নমিনাল মজুরি বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৫০৪ টাকা।

প্রকৃত মজুরির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ২০২২ সাল পূর্ববর্তী চার বছরে বাংলাদেশে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম-বেশি বেড়েছে। তবে ২০২২ সালের চিত্র ছিল ভিন্ন, এ বছর প্রকৃত মজুরি কমেছে। আইএলওর তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি হয় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধি কমে যায়, যার হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধির হার আবারো বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে। ২০২২ সালে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে আইএলওর তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। যার হার ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তাব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি ও কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জরিপ প্রতিবেদনের সঙ্গে এ তথ্য পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ না। কারণ বিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৬-২২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে মোট দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য কমেছে। তবে গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, সরকারি সমীক্ষার আয়বৈষম্য চিত্র থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে প্রকৃত মজুরি কমেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের খানা জরিপ ২০২২-এর যে ফলাফল তাতে দেখা যায় ২০১৬-২২-এর মধ্যে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্য ও মোট দারিদ্র্য কমেছে। শহর ও গ্রাম দুই ক্ষেত্রেই যা প্রযোজ্য। প্রকৃত মজুরি কমলে দারিদ্র্য কমার প্রশ্ন আসত না। যারা ওয়ার্কিং পুওর তাদের ভোগের মূল ক্ষেত্রই হলো মজুরি বাবদ আয়। বলা যায় প্রকৃত মজুরি যে হারে বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে ধনীদের আয় বা যারা দরিদ্র না তাদের আয়। ফলে বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে কিছুটা বৈষম্য কমলেও শহরাঞ্চলে বৈষম্য তীব্রভাবে বেড়েছে এ সময়ে। কভিডকালীন প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় আমাদের ভি-শেপ রিকভারি হয়েছে। এ সময় মোট দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য দুটোই কমেছে।’

এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণাগুলোয় দেখা গেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অবনমন হয়েছে। বিবিএসের খানা জরিপের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, দেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে। বিবিএসের হিসাবে অতিদারিদ্র্য কমেছে, সাধারণ দারিদ্র্যও কমেছে। যদিও কমার হার আগের চেয়ে কম। আগে ২ শতাংশ হারে কমলেও সর্বশেষ হিসাবে কমেছে ১ শতাংশ করে। আমাদের দারিদ্র্য নিরসনের স্থিতিস্থাপকতা জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাপেক্ষে শ্লথ। আরেকটা বিষয় হলো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত যেসব পণ্য ক্রয় করে সেসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বার্ষিক মজুরি ৫ শতাংশ করে বৃদ্ধির যে হার সেটার সঙ্গে তুলনা করলে অবশ্যই ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মূল্যস্ফীতিও ৫ শতাংশ থেকে বেশি ছিল। সেটা থেকেও বোঝা যায় ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সরকার সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে ভোগ বৈষম্য যেন না বাড়ে সেটার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এর আওতায় অনেকেই আসেনি। যেমন শহুরে শ্রমিকরা আসেনি। তেমনি গ্রামেও সবাই এ সামাজিক সুরক্ষায় আওতায় আসেনি। সেটারও একটা প্রভাব ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়েছে। সার্বিকভাবে ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে প্রকৃত মজুরি কমেছে।’

বিবিএসের খানা জরিপে উঠে এসেছে কভিড মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সেখান থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ২০২২ সালে তা নেমে আসে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। একই সময়ে অতিদারিদ্র্য ১২ দশমিক ৯ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে।

খানার আয়-ব্যয় জরিপে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এখন খানাপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। ২০১৬ সালে তা ছিল ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। একই সময় আয়ের মতো ব্যয়ও বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এ সময় গড় মাসিক ব্যয় ১৫ হাজার ৭১৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা।

শ্রম খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন যে মজুরি কাঠামোগুলোর ঘোষণা হচ্ছে সেগুলো মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বৈশ্বিক সংকটে কিছুটা প্রভাব শ্রম খাতের প্রকৃত মজুরিতে পড়লেও তা কতটুকু, সে বিষয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেই বলা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিক্রমায় বাংলাদেশের প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি কমেছে কিনা সেটা বিশ্লেষণ না করে বলা সম্ভব না। আমরা যে খাতগুলোর মজুরি ঘোষণা দিই, সেই খাতগুলো মজুরি নিম্নতম কাঠামো মেনেই মজুরি পরিশোধ করছে। গত এক বছরে নতুন যে মজুরি কাঠামোগুলোর ঘোষণা হয়েছে সেগুলো মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যুগোপযোগী করেই নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়।’

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ সময় খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যসূচক ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ।