কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ইছার উদ্দিনের স্ত্রী সুমি। ইমুতে তার কাছে ২৫ সেকেন্ডের একটি ভয়েস রেকর্ড আসে। সেখানে প্রচণ্ড মারধর আর চিত্কারের শব্দ। এর ৪৮ ঘণ্টা পর একই প্রক্রিয়ায় আসে আরেকটি ভয়েস রেকর্ড। দ্বিতীয় রেকর্ডটিতে সুমি তার স্বামীর গলা নিশ্চিত হন। ওই রেকর্ডটি জুড়ে আর্তনাদ। শোনা যায়, ‘আমার হাত ও পা ভেঙে ফেলেছে, আমি মরে যাচ্ছি, তুমি টাকা দিলা না। তোমারে না কইছি দুলাভাইকে বলো, তাড়াতাড়ি ১০ লাখ টাকা দিতে। এরা মানুষ মেরে ফেলছে।’ গত মে মাসের ১৩ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে বাঁচার আকুতি জানিয়ে মোট ১১টি ভয়েস রেকর্ড পাঠানো হয় স্ত্রী সুমির ফোনে। এরপর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ইছার উদ্দিন। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা।

রেকর্ডের সূত্র ধরে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন সুমির দুলাভাই মোহাম্মদ আলী। এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে লোমহর্ষক কাহিনী উদঘাটন করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে সুজন নামের ৩ নম্বর আসামিকে। তিনি আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। আরো দুজনকে গোয়েন্দা হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুতই সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে বলে গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশ জানায়, বিদেশে নিয়ে যাওয়া জিম্মি চক্রের ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে দুবাইয়ে অবস্থানরত আফ্রীন আহমেদ মূল হোতা। সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ঢাকায় অবস্থান করেন সুজন, মামুন ও কাউসার। ঢাকার ফার্মগেটের ১৪৫/২৫ মনিপুরিপাড়ার ট্রেড ট্রাভেলস নামের প্রতিষ্ঠান থেকে এসব অপকর্ম চালানো হয়েছে। মানব পাচার সিন্ডিকেট সদস্যরা দুবাই, আম্মান ও লিবিয়া হয়ে ইতালিতে অবৈধভাবে লোক পাঠায়। বিদেশে লোক নেয়ার পর তাদের জিম্মি করে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ করে টাকা আদায় করা হয়। এসব টাকার ভাগ দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত মুক্তিপণ আদায়কারীদের কাছে পৌঁছে যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহাদত হোসেন জানান, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দুবাইয়ে যাওয়ার পর আফ্রীন আহমেদ তাদের রিসিভ করেন। এ সময় তাদের (অভিবাসনপ্রত্যাশী) নীল গেঞ্জি (টি-শার্ট) পরিয়ে দেয়া হয়। নীল টি-শার্ট পরা থাকলেই আফ্রীন বুঝতে পারেন এরা তার লোক। সেখান থেকে তাদের জর্ডানের রাজধানী আম্মানে পাঠানো হয়। এরপর টিয়া কালারের গেঞ্জি পরিয়ে জর্ডানের নাগরিকের হাতে তুলে দেয়া হয়। সেখান থেকে তাদের নেয়া হয় লিবিয়া। সেখানে যাওয়ার পর পরানো হয় সাদা-কালো গেঞ্জি। লিবিয়ার এয়ারপোর্টে সজীব, মানিক ও জাফর অবস্থান করেন। সাদা-কালো গেঞ্জি দেখলেই তারা বুঝতে পারেন এই ব্যক্তিরা তাদের মক্কেল। পরে তাদের লিবিয়া থেকে নৌকা বা স্পিডবোটে মাল্টা হয়ে অবৈধভাবে ইতালি পাঠানো হয়।

তিনি আরো জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুজন ডিবিকে জানায়, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জগন্নাথপুরে। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়। তার ছোট ভাই সজীব লিবিয়ায় থাকে। তার মাধ্যমে ভৈরবের জগন্নাথপুরের সজল (২৬), লক্ষ্মীপুর গ্রামের বিজয় (২২) ও নুরআলীপুরের ইছার উদ্দিন লিবিয়ায় গিয়েছেন। এদের মধ্যে বিজয় ও ইছার উদ্দিন নিখোঁজ অছেন। সজল ওই হামলায় আহত হয়েছেন। পাচারকারী চক্রের সদস্য জাফরের মাধ্যমে সজীব এই তিনজনকে লিবিয়ায় নিয়ে যান। এর আগেও জাফরের মাধ্যমে অনেক লোক পাঠানো হয়েছে।

গত ২৮ মে লিবিয়ায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যা করে স্থানীয় মানব পাচারকারীরা। এ সময় জখম হন আরো ১১ বাংলাদেশী। অবৈধভাবে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এসব বাংলাদেশীকে বাড়তি আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়া পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের উরোপে নেয়ার কথা থাকলেও তার আগেই জিম্মি করে চালানো হয় নির্যাতন। সেসব দৃশ্য কখনো রেকর্ড করে কখনো আবার ভিডিও ধারণ করে পাঠানো হয়েছে স্বজনদের কাছে। আদায় করা হয়েছে মুক্তিপণের অর্থ। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, আইজিপির কঠোর নির্দেশে তাত্ক্ষণিকভাবে র্যাব, ডিএমপি, সিআইডি, পিবিআইসহ বাংলাদেশ পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট একযোগে দেশজুড়ে অভিযান শুরু করেছে। এ পর্যন্ত লিবিয়ায় অবৈধভাবে মানব পাচারের ঘটনায় ২২টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩ জনকে।

এদিকে লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। এ ঘটনার পর পরই এ বিষয়ে আয়োজিত এক জরুরি ভিডিও কনফারেন্সে আইজিপি বলেন, যেভাবে আমাদের দেশের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জরুরি এই ভিডিও কনফারেন্সে বাংলাদেশ পুলিশ সব ইউনিট প্রধানসহ পুলিশের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন। পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উদ্দেশে আইজিপি বলেন, আমাদের দেশের মানুষকে এভাবে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে, সেই অবস্থানে এখন বাংলাদেশ নেই। যারা আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়েছে, যাদের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তাদের একজনকেও ছাড় দেয়া হবে না। তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে এ চক্রের প্রত্যেক সদস্যকে আইনি প্রক্রিয়ায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশীকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে, তার জীবন নিয়ে খেলার দুঃসাহস কোনো মানুষ দেখাতে না পারে। দেশে ও বিদেশে যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, এদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করা হবে বলেও ঘোষণা দেন পুলিশপ্রধান।