তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ফলাফলে কারচুপির কারণে পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে গণতন্ত্র ও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সেটি আমরা মেনে নিয়েছি। কারণ আমরা চাই জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর করতে। কারণ সংবিধান সংস্কার না হলে বাংলাদেশ আসলে আগের বাংলাদেশই থাকবে। শেখ হাসিনার কাঠামো থাকবে, শুধু অন্য মানুষেরা দেশ চালাবে।’

গতকাল দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে দলীয় পর্যালোচনা জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল এনসিপি।

এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য রক্ষা করে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা করতে তারেক রহমান ব্যর্থ হয়েছেন। তারুণ্যকে প্রাধান্য দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। হত্যা মামলার আসামিকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। এদের দিয়ে তারেক রহমান দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে পারবেন না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির গ্রিন সিগন্যাল (সবুজ সংকেত) রয়েছে বলে মনে করছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বিএনপির কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না। এবারের নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘অবিলম্বে প্রশাসনিকভাবে সেই কার্যালয় বন্ধ করায় যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধের ডাক দেব। সেটার জন্য এ সরকারকেও আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাব ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের দায়ে।’ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করায় কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বেসরকারি এখন টিভির দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো দলীয় গণমাধ্যম চাই না। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে সেই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। আমরা আশা করব, এ মুহূর্ত থেকে এটা বন্ধ হবে, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে।’

দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, একটি ভুল ব্যাখ্যা ও সংবিধানের দোহাই দেয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যপদে শপথ না নিয়ে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে, গণভোটের গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। সংসদকে কার্যকর করতে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হোক। সংস্কার পরিষদ ছাড়া এ জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই।

আইনের শাসন নিশ্চিত করা, পুলিশে দলীয়করণ বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া, রাস্তাঘাটে চলাফেরায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব সংস্কৃতি বন্ধ করা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাজার ভাংচুরে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার, বিরোধী দলের ওপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। রমজানে দ্রব্যমূল্য সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাগালে রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেও নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপি সরকারের ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় কোনো নতুনত্ব দেখছেন না বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ মন্ত্রিসভা দেখে আমাদের কাছে কোনোভাবেই মনে হয়নি, এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এখানে পুরনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এ মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। মন্ত্রিসভায় নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট পরিমাণে হয়নি। সার্বিকভাবে এটা প্রতিনিধিত্বমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা হয়নি।’ কিছু ভালো ও অভিজ্ঞ লোকও নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন উল্লেখ করে সেটিকে সাধুবাদও দেন নাহিদ। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের স্থান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, মাহবুব আলম, যুগ্ম সদ স্যসচিব সালেহউদ্দিন সিফাত, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।