নেত্রকোনার দুর্গাপুরে টংক আন্দোলন তথা হাজং বিদ্রোহের সংগ্রামী নেত্রী কমরেড কুমুদিনী হাজং (৯২) আর নেই। গতকাল দুপুরে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তিনি তিন ছেলে, দুই মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে পাহাড়ি অঞ্চলের এক টিলায় বসবাস করতেন তিনি। কুমুদিনী হাজং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, টংক আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি জুলুম, বৈষম্য, নিপীড়ন, ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন কালের সাক্ষী।
তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ কৃষকদের টংক আন্দোলন দমাতে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘরে হানা দেয়। এরই অংশ হিসেবে আন্দোলনকারী হাজংদের নেতা লংকেশ্বর হাজংকে ঘরে না পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ তার স্ত্রী কুমুদিনীকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছিল। এ খবর পেয়ে বহেড়াতলী গ্রামের রাশিমনি হাজং শতাধিক নারী-পুরুষ নিয়ে দা, ঢাল, বল্লম, লাঠি, তীর-ধনুকসহ সোমেশ্বরী নদীতীরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু পুলিশ কোনো কথা না শুনে টেনেহিঁচড়ে কুমুদিনীকে দুর্গাপুর পুলিশ ফাঁড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন রাশিমনি হাজং দা দিয়ে পুলিশদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলে এক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে মারা যান। পুলিশের পাল্টা গুলিতে রাশিমনি হাজং নিহত হন। এ সময় সুরেন্দ্র হাজং সেই পুলিশকে কুপিয়ে মেরে ফেলেন। এ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ২২ জন হাজং নারী-পুরুষ মারা যায়। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ কুমুদিনী হাজংকে ফেলে রেখে চলে যায়। গ্রামবাসীর ওপর আরো হামলা হতে পারে— এ ভয়ে মরদেহগুলো সোমেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ বহেড়াতলী গ্রামে তাণ্ডব চালায় এবং পুরো গ্রাম তছনছ করে ফেলে। এ ঘটনার পর থেকে রাশিমনি হাজং ও কুমুদিনী হাজংয়ের সাহসী লড়াই সংগ্রামের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
জীবিতকালে কুমুদিনী হাজং বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৯ সালে তেভাগা কৃষক আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে পুরস্কার, ২০০৩ সালে অনন্যা শীর্ষ ১০ নির্বাচিত পুরস্কার, ২০০৫ সালে স্বদেশ চিন্তা সংঘ ড. আহম্মদ শরীফ স্মারক পুরস্কার, ২০০৭ সালে মণি সিংহ স্মৃতিপদক পুরস্কার, ২০১০ সালে সিধু কানহু ফুলমনি পদক, ২০১৪ সালে জলসিঁড়ি পদক, ২০১৮ সালে হাজং জাতীয় পুরস্কার, ২০২১ সালে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক সম্মাননা ও ২০২২ সালে পথ পাঠাগার সম্মাননা।
তার মৃত্যুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেমন্ড আরেং, দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম রকিবুল হাসান, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা কমরেড ডা. দিবালোক সিংহ, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির পরিচালক সুজন হাজংসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক জানিয়েছে। আজ সকালে স্থানীয় শ্মশানঘাটে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।









