সংশোধনের পর চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার ১৯৮ কোটি টাকায়। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে সংশোধিত এডিপির মধ্যে ব্যয় করতে পেরেছে ৯০ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। ব্যয় করা যায়নি বরাদ্দের বাকি ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন সূত্রে এ কথা জানা গেছে।
আইএমইডি বলছে, বাস্তবায়নের হার বিবেচনায়, নয় মাসে মোট বরাদ্দের ৪৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৫ শতাংশ তিন মাসে ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ এখন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সামনে। চলমান পরিস্থিতিতে অর্থবছরের বাকি তিন মাসে এ অর্থের কতটুকু ব্যয় করা যাবে, সে বিষয় নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়। কারণ চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে গত মাসে পুরোপুরি থমকে ছিল অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন।
এ অবস্থা বিরাজ করতে পারে চলতি মাসেও। ফলে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জুন শেষেও প্রকল্প বাস্তবায়নে খুব বেশি গতি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে এবার এডিপির বড় অংকের টাকা অব্যয়িত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সামনে করোনাসংশ্লিষ্ট নতুন কিছু প্রকল্প অনুমোদন পাবে। ফলে এডিপিতে বেশকিছু ক্ষেত্রে পরিবর্ধন ও পরিবর্তন আসতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্য, খাদ্য ও কৃষি খাতের জন্যও নতুন প্রকল্প আসবে। সেসব খাতে এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। সেগুলোয় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া পরিস্থিতি উন্নতি হলে জুনেও চলমান প্রকল্পের কিছু অর্থ ব্যয় হবে।
আইএমইডির তথ্যমতে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ১১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়নের হার ২০ শতাংশের নিচে। আবার যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে, অর্থ অব্যয়িত রয়ে গেছে তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পাঁচটি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো স্থানীয় সরকার বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ ছয় বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করেছে প্রায় ৫৪ হাজার ২০৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অব্যয়িত রয়ে গেছে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে সরকারের ৫৮ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মোট অব্যয়িত অর্থের প্রায় ৫৭ শতাংশই থেকে গেছে এ ছয় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের হাতে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, এডিপি সম্পূর্ণভাবেই পুনর্বিন্যাস করতে হবে। অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এখনকার প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ রয়েছে। সেজন্য অগ্রাধিকার খাতগুলোকে চিহ্নিত করে এখনই অর্থ বরাদ্দ বাড়িয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। তেমনি অপ্রয়োজনীয় ও অর্থনীতির জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলো থেকে প্রকল্প বাদ দিতে কিংবা স্থগিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে এমআরটি, পদ্মা সেতু কিংবা কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্প চলমান রেখে বাকি প্রকল্পগুলো স্থগিত রাখতে পারে সরকার। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কার্যক্রমে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও যাতে অর্থ সংকট তৈরি না হয়, সেজন্যও এডিপি পুনর্গঠন প্রয়োজন।
এডিপি বাস্তবায়নে অবিলম্বে চারটি খাতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ড. জাহিদ হোসেন। খাত চারটি হলো স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও কৃষি এবং শিল্প ও বাণিজ্য। তিনি বলেন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতে চলতি ও বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াতে হবে। এর পরই গুরুত্ব দিতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। সেখানে কর্মহীন ও প্রান্তিক মানুষদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অর্থ ও খাদ্যসহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি গোটা বিশ্বেই খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষি ও খাদ্য খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্প নিয়ে আসতে হবে। এ দুটি ক্ষেত্রে সক্ষমতা গড়ে তুলতে না পারলে চলমান করোনা পরিস্থিতি আরো বড় বিপদ নিয়ে আসতে পারে। এর পরই শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। সেখানে দেশী শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে সুরক্ষা দিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আইএমইডির তথ্যমতে, ২০১৫-১৬-এর পর এবারই অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার সবচেয়ে কম। ওই অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়সীমায় সংশোধিত এডিপির মাত্র ৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো।
আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পিছিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে বরাদ্দের ১০ শতাংশেরও কম ব্যয় করতে পেরেছে দুটি মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ) ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ)। এছাড়া ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি এমন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে সুরক্ষা সেবা বিভাগ (১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ), খাদ্য মন্ত্রণালয় (১৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ), পরিবেশ বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় (১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ), আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (১২ দশমিক ৬৯ শতাংশ), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (১২ শতাংশ), সরকারি কর্ম কমিশন (১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ), পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ)।
এদিকে যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ৫০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এ বিভাগের মোট বাস্তবায়ন ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া এগিয়ে থাকা অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (৮৯ দশমিক ২৭ শতাংশ), বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় (৬৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ), জাতীয় সংসদ সচিবালয় (৫৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (৬৩ দশমিক ১৬ শতাংশ) ইত্যাদি। এছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগ সংশোধিত এডিপির ৫৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, শিল্প মন্ত্রণালয় ৫২ দশমিক ৩৬, স্থানীয় সরকার বিভাগ ৫০ দশমিক ৯৪ ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫০ দশমিক ৮১ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।










