আধুনিক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নানা শর্ত পূরণের মাধ্যমে এসব ইয়ার্ডে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কথা। তাতে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে দীর্ঘদিনের দুর্ঘটনা ও শ্রমিক হতাহতের ঘটনা কমে আসার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অবকাঠামো ও সনদে পরিবর্তন এলেও জাহাজ কাটার অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা হচ্ছে পুরনো পদ্ধতি। ঝুঁকি শনাক্ত, গ্যাস মনিটরিং, শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারে রয়েছে ঘাটতির অভিযোগ। ফলে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হওয়ার পরও থামছে না শ্রমিকের মৃত্যু।

এর সর্বশেষ উদাহরণ গতকাল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় নয় শ্রমিকের মৃত্যু। এর আগে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এসএন করপোরেশন নামের একটি ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় গ্যাস বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন সাত শ্রমিক।

একের পর এক এমন ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের পরও কেন শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসছে না কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। একই সঙ্গে পুরনো জাহাজ ভাঙার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া ছাড়পত্র এবং জাহাজের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডের ওই শিপইয়ার্ডের ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), হাবিবুর রহমান (৫১), পলাশ দাশ (৩৫), সানি দাশ (২৩) ও মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩)। এছাড়া বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে শরীফ নামের আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আলা উদ্দিন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ইয়ার্ডটিতে জাহাজ কাটার কাজ ছিল না। কাটার জন্য রাখা জাহাজগুলোয় মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছিল। সকালে ইয়ার্ডের সেফটি অফিসার কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে জাহাজের অভ্যন্তরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম দেখতে যান। এ সময় সেখানে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে তারা অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা অন্য শ্রমিকরা বিষয়টি দেখে কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের উদ্ধারে জাহাজের অভ্যন্তরে ছুটে যান। তারাও বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজন জ্ঞান হারান।

ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের অভিযোগ, নিহত ও আহতদের কারো শরীরেই যথাযথ সুরক্ষা পোশাক ছিল না। ইয়ার্ডটিতে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মেশিনারিজ ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হয় না। গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অনেক কাজ এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে আশপাশের এলাকায়ও অনেকের শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দেয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও এলাকায় গ্যাসের প্রভাব ছিল বলে দাবি করেছেন তারা।

এ দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পরও একটি গ্রিন ইয়ার্ডে আনা স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কীভাবে এত প্রাণঘাতী মাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি থাকল? জাহাজ ভাঙা শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পুরনো একটি জাহাজে গ্যাস ট্যাংক বা জ্বালানি ট্যাংক ছাড়াও বিপুলসংখ্যক পাইপলাইন, ছোট-বড় ট্যাংক, ব্যালাস্ট বা ব্যালান্স ওয়াটার ট্যাংক এবং বিভিন্ন আবদ্ধ স্থান থাকে। এসব স্থানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পয়োবর্জ্য, পানি, জ্বালানি তেল, খাদ্যবর্জ্য ও অন্যান্য জৈব পদার্থ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে মূলত গ্যাস ট্যাংক, জ্বালানি ট্যাংক ও ইঞ্জিন রুমসহ বিস্ফোরক ঝুঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশ পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দেয়া হয়। অন্য পরিবেশগত বিষয়গুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। তাদের দাবি, একটি জাহাজ ইয়ার্ডে আনার পর দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে বিভিন্ন বর্জ্য ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নতুন করে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরবর্তী ঝুঁকি সবসময় প্রাথমিক ছাড়পত্রের আওতায় পড়ে না। ফলে জাহাজ ইয়ার্ডে পৌঁছার পর থেকে প্রতিটি কাজের আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও গ্যাস পরীক্ষা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একটি বিশালাকার জাহাজের সব আবদ্ধ স্থান ও সরঞ্জামের যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি অংশ পরীক্ষা করে দেয়া ছাড়পত্র কতটা কার্যকর, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গতকাল দুর্ঘটনার সূত্রপাত জাহাজটির ব্যালাস্ট বা ব্যালান্স ওয়াটার ট্যাংকে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ওই অংশে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা। বিষাক্ত গ্যাসের সম্ভাবনা থাকা একটি আবদ্ধ স্থানে কীভাবে পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া শ্রমিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হলো, তা তদন্তের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।

9f44b633-9219-4f87-b308-41731befecaf

নিয়ম অনুযায়ী, পুরনো জাহাজের বিভিন্ন অংশ কাটা, পরিষ্কার বা সরঞ্জাম অপসারণের প্রতিটি ধাপেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্তের কথা। বিশেষ করে আবদ্ধ স্থানে প্রবেশের আগে গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু গতকালের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, একজনের পর একজন শ্রমিক কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করেছেন। এতে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমও পরিণত হয় নতুন বিপদের কারণ।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করলেই একটি ইয়ার্ড প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হয়ে ওঠে না। আধুনিক প্লাটফর্ম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা নির্দিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কাজের পদ্ধতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আনতে হয়। তাদের মতে, প্রতিটি জাহাজকে আলাদাভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা তৈরি, আবদ্ধ স্থানে প্রবেশের আগে গ্যাস মনিটরিং, শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে গ্রিন ইয়ার্ডের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

কাজের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের শোভন কর্মপরিবেশের অভাব এবং জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের শিপইয়ার্ডগুলোকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তরের তাগিদ আসে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে। এরই অংশ হিসেবে জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিচালনায় হংকং কনভেনশনের বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের জুন থেকে জাহাজ ভাঙা শিল্প হংকং কনভেনশনের সার্টিফিকেশন রুলস অনুযায়ী পরিচালনার বাধ্যবাধকতা কার্যকর হয়েছে। এ নিয়ম অনুযায়ী, আধুনিক ও অনুমোদিত গ্রিন শিপইয়ার্ড ছাড়া অন্য কোনো ইয়ার্ড স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। দ্য শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস, ২০১১, আন্তর্জাতিক আইন এবং ২০০৯ সালের হংকং কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী ইয়ার্ড পরিচালনার কথা।

২০০৯ সালে চীনের হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ৬৩টি দেশের কূটনৈতিক সম্মেলনে হংকং কনভেনশন গৃহীত হয়। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও), সদস্য রাষ্ট্র, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং বাসেল কনভেনশনের পক্ষগুলোর সহযোগিতায় এটি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সনদ ও আধুনিক অবকাঠামো যুক্ত হলেও দেশের অনেক ইয়ার্ডে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ফলে গ্রিন ইয়ার্ডের কাঠামো তৈরি হলেও জাহাজ ভাঙার কাজের ধরন ও শ্রমিক নিরাপত্তার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে রয়ে গেছে আগের অবস্থায়।

শ্রম আইন অনুযায়ী, শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিক পক্ষের। প্রতিটি ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন ও কার্যকরভাবে পরিচালনারও বিধান রয়েছে। মালিক পক্ষের তিনজন ও শ্রমিক পক্ষের তিনজন প্রতিনিধি নিয়ে ছয় সদস্যের এ কমিটি গঠনের কথা।

নিয়ম অনুযায়ী, কমিটিকে প্রতি মাসে অন্তত একটি সভা করতে হবে। সভায় শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়টি তদারক, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং কর্মঘণ্টা অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা। তবে ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, অধিকাংশ ইয়ার্ডেই এসব ব্যবস্থা কার্যকর নয়। কোথাও কোথাও নামমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো নিয়মিতভাবে কার্যকর করা হয় না। দু-একটি ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি থাকার উদাহরণ দেখিয়ে পুরো শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কার্যকর রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএনজি বা তেলবাহী পুরনো জাহাজের বিভিন্ন অংশে নানা ধরনের ক্ষতিকর গ্যাস থাকতে পারে। এসব গ্যাস পুরোপুরি অপসারণ বা কোনো আবদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে গ্যাস মনিটরিং মিটার দিয়ে পরীক্ষা করা জরুরি। গ্যাস মনিটরিং মিটারে ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার সংকেত পাওয়া গেলে ওই স্থানে শ্রমিকদের প্রবেশ বন্ধ রাখতে হয়। নিরাপদ মাত্রা নিশ্চিত হওয়ার পরই সেখানে কাজ শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ঘটনায় এ ধরনের পরীক্ষা যথাযথভাবে করা হয়েছিল কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’

মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ‘ইয়ার্ড আধুনিক করার পাশাপাশি সেখানে কাজের ধরনও আধুনিক করতে হবে। সেফটি পোশাক ব্যবহার, জাহাজ কাটার কাজে প্রয়োজনীয় মেশিনারিজের ব্যবহার এবং গ্রিন ইয়ার্ডের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কাজ করার জন্য শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের আলাদা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

জাহাজ ভাঙা শিল্পের সংগঠন বিএসবিআরএর সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত। কীভাবে এ ঘটনা হলো তার জন্য পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। নিহতদের ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। গ্রিন ইয়ার্ডে শ্রমিকদের সেফটি পোশাক পরিধান করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলা এবং মেশিনারিজ ব্যবহারে সতর্কতা নিয়েই কাজ করতে হবে। এভাবে কাজ না করলে গ্রিন ইয়ার্ডের সুফল পাওয়া যাবে না।’

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এসএম শাখাওয়াত হোসেন বণিক বার্তাকে জানান, দুর্ঘটনা ঘটা এমভি রাসি জাহাজটিতে মূলত এলএনজি পরিবহন করা হতো। জাহাজটিতে থাকা বিভিন্ন সেপটিক ট্যাংক বা জমে থাকা পানির মাধ্যমে এ হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উৎপাদন হয়। এ গ্যাসে আক্রান্ত হলে দ্রুত মৃত্যু হতে পারে। গত বছর জুন-জুলাইয়ে জাহাজটির এলপিজি গ্যাস বহনকারী ট্যাংক, ইঞ্জিন রুম ও তেলের ট্যাংক পরিদর্শন করে যথাযথভাবে সনদ দেয়া হয়েছিল। জাহাজটিতে অনেক ধরনের বিপজ্জনক বর্জ্য, গ্যাস আছে কিনা, সেগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটেছে জাহাজের ব্যালান্স ট্যাংকে, যেখানে পানি দিয়ে জাহাজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ছাড়পত্র দেয়ার এক বছর পর দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যালান্স ট্যাংকের সঙ্গে জাহাজে থাকা পয়োবর্জ্যে কিংবা খাবারসহ অন্যান্য কোনো পদার্থের মিশ্রণে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

হাইড্রোজেন সালফাইড সম্পর্কে চিকিৎসকরা জানান, জাহাজটির সেপটিক ট্যাংক, ড্রেন বা নোংরা জলাশয়ে অক্সিজেন না থাকায় সেখানে ব্যাকটেরিয়া জমে পচে গেলে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস সৃষ্টি হয়। এ গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত এবং এর গন্ধ অনেকটা পচা ডিমের মতো। এ গ্যাস নিশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে কোষের অক্সিজেন ব্যবহারের প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। তীব্র বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারেন। এতে তীব্র বিষক্রিয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ, ফুসফুসে তরল জমা, হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে দ্রুত মৃত্যুও ঘটে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অঞ্চল) শ্রীরূপ মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ৫২৯তম সভায় ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী এমভি রাশি জাহাজটির ছাড়পত্র জারির সুপারিশ করা হয়। এ সভার আগে জুলাইয়ে জাহাজটি সরজমিনে পরিদর্শনে ভারী বা বিষাক্ত কোনো বর্জ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে তাদের এসআরপি প্ল্যান দেয়া হয়। এ প্ল্যানে জাহাজটি কখন কোন সময়ে কোন অংশ কাটা হবে, সেই বিষয় উল্লেখ থাকে।’

তিনি জানান, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী, শিপইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের মূল কারণ হলো শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের মৃত্যু জিরোতে নিয়ে আসা, কর্মক্ষেত্রে জাহাজ কাটার কাজ ম্যানুয়ালি না করে ডিজিটালি করা। কিন্তু শিপইয়ার্ডগুলোতে এখনো আগের পদ্ধতিতে গোপনীয়ভাবে কাজ করা হয়। এতে প্রায়ই এ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নিয়মিত তদারকি বাড়ানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৬ জুন কনভেনশন কার্যকর হওয়ার আগে দেশে ৪০-৫০টি ইয়ার্ড নিয়মিত স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করত। চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে ২৫টি। আরো ছয়টি ইয়ার্ড প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩১-এ।

আইএমও-৯১৭৬০০৮ নম্বরের এমভি রাশি জাহাজটি ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত। প্রায় ২৮০ মিটার দীর্ঘ এ জাহাজ দীর্ঘদিন এলএনজি ক্যারিয়ার হিসাবে গ্যাস পরিবহন করেছে। ফলে এর ট্যাংক, পাইপলাইন ও বিভিন্ন কম্পার্টমেন্টে এলএনজি-সংক্রান্ত অবশিষ্ট গ্যাস, তেল, স্লাজ বা অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ থাকার সম্ভাবনা ছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরের ৫২৯তম সভার কার্যবিবরণীতে এমভি রাশি কাটার জন্য বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, তেলযুক্ত বর্জ্য সংরক্ষণ, নিরাপদ প্রবেশ, গ্যাস মনিটরিং এবং ‘সেফ ফর জট ওয়ার্ক’ নিশ্চিত করাসহ একাধিক শর্ত দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব শর্ত বাস্তবে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে সে বিষয়ে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই তদারকি করেনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।