কৃষি খাসজমির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ, কৃষিজমির সুরক্ষা ও কৃষিজমি অধিগ্রহণ, ভূমি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ ও ভূমি ব্যাংক, নগর দরিদ্রদের খাসজমিসহ অন্যান্য নাগরিক সেবায় অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ কৃষি ও ভূমি সংস্কারে ৩৬টি প্রস্তাবনা দিয়েছে ভূমি ও মানবাধিকারভিত্তিক ১৩ সংগঠন। বিভিন্ন জেলা থেকে ৯০ হাজার কৃষিজীবী মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে এই সংস্কার কমিশনের দাবির সমর্থনে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর আবেদনও পাঠানো হয়েছিল বলে জানান বক্তারা।
আজ রোববার (২০ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের সার্বিক ভূমি ও কৃষি সংস্কার বিষয়ক নাগরিক প্রস্তাবনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এএলআরডি, নিজেরা করি, বারসিক, টিআইবি, বারসিক ও ব্লাস্টসহ মোট তেরোটি সংগঠনের উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এ সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে কৃষি ও ভূমি সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা সে লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য আশু করণীয় উত্থাপন করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, একটি স্থায়ী জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন গঠন; সিএস রেকর্ডসহ নির্ভরযোগ্য রেকর্ড অনুযায়ী খাসজমি এবং নগরের অকৃষি খাসজমির পূর্ণাঙ্গ জেলা-উপজেলা, পৌর এলাকা ও মহানগরভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন; অবিলম্বে খাস কৃষিজমি গ্রামীণ ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, কৃষিজীবী দলিত, সমতলের আদি জাতিগোষ্ঠীর ভূমিহীনদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বণ্টনের নির্দেশনা জারি করা; নারীদের ক্ষেত্রে সক্ষম পুত্র সন্তান থাকার অবৈধ, বৈষম্যমূলক বিধানটি অবিলম্বে বাতিল করা; কৃষিজমি সুরক্ষা আইন অবিলম্বে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা এবং কৃষিজমি সুরক্ষার কঠোর সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ভূমি জোনিং ব্যবস্থা সুচারুরূপে সম্পন্ন করে নগরায়ন, শিল্পায়ন, আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজনের নিরিখে অকৃষিজমি শনাক্ত করা এবং একই সঙ্গে দুই বা তিন ফসলি কৃষিজমিতে কোনো সরকারি, বেসরকারি প্রকল্প না করা ও থাকলে তা বাতিল করা, কৃষিজমিতে আবাসন কিংবা ইটভাটা অবিলম্বে উচ্ছেদ করা; কৃষিজমি অথবা জলাধারের মধ্যে অনুমোদনবিহীন আবাসন প্রকল্প কিংবা শিল্প স্থাপনার সাইনবোর্ড সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা; নগর দরিদ্র, বিশেষত বস্তিবাসী দরিদ্রদের নিবন্ধন ও তাদের ডাটাবেজ প্রণয়নের নির্দেশনা জারি করা, তাদের নগরে অস্থায়ী এবং স্থায়ী আবাসন সুবিধার প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৯০ হাজার কৃষিজীবী মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে এই সংস্কার কমিশনের দাবির সমর্থনে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর আবেদনও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সরকার সে আবেদনে সাড়া দিয়ে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। এ প্রেক্ষাপটে আমরা কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা—যারা ভূমি ও কৃষির অধিকার, পরিবেশ, বীজ ও মানবাধিকারের সুরক্ষায় কাজ করে থাকি—তারা বাংলাদেশের ভূমি ও কৃষি সংস্কারের জন্য একটি বিকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। এই প্রস্তাবনায় অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আশু করণীয় যেমন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরবর্তী যে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে তাদের জন্যও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবনাগুলো আমরা খসড়া আকারেই দিচ্ছি। এসব প্রস্তাব নিয়ে আরো বিশদে আলোচনা, পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য যথাসম্ভব ঐকমত্য সৃষ্টির প্রচেষ্টাও নেয়া হবে। আমরা আগামী নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও এসব বিষয়ে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেব।
নাগরিক নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ভূমি ও কৃষি সংস্কার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রের অন্যান্য বিষয়ে সংস্কার কমিটি গঠিত হলেও এ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠিত হয়নি। বর্তমানে অনেকগুলো সংগঠন পরিবেশ, ভূমি ও কৃষি নিয়ে কাজ করছে। আমরা সবাই মিলে একটা সংস্কার প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছি। অন্তর্বর্তী সরকার যদি চায়, আমরা এ সংস্কার প্রস্তাবনা জমা দিতে পারি। সরকার যদি নাও চায়, তাও আমরা তা জমা দেব।
এ সময় বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, ৩৬টি দাবি নিয়ে আমরা একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছি, যেখানে ভূমি ও কৃষি খাতে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত বিষয়গুলো উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সংকট তুলে ধরে এবং তা সমাধানের জন্য এ প্রচেষ্টা।
ব্লাস্টের পরিচালক অ্যাডভোকেট বরকত আলী বলেন, বাংলাদেশে ৭২-৭৫ শতাংশ মামলাই ভূমি-সংক্রান্ত। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা বিদ্যমান। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সংস্কারের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব মানুষ ভূমিহীন রয়েছে, তাদের খাসজমি প্রদানের মাধ্যমে ভূমির ব্যবস্থা করে দেয়া দরকার।
সভাপতির বক্তব্যে এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবির বলেন, ভূমি ও কৃষি সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সংস্কার কমিশন গঠিত হওয়া উচিত। তবে আমরা আশাবাদী ১২টি সংস্কার কমিশনের পরবর্তী সংস্কার কমিশন হিসেবে ভূমি ও কৃষিজমি সংস্কার কমিশন গঠিত হবে। অন্যান্য সংস্কারের মতো এ সংস্কার কমিশনও যদি গঠিত হয়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ভূমি ও কৃষি নিয়ে কার্যক্রমের পথ সুগম হবে।










